শিরোণামহীন বেদনার গদ্য :✍️হারান কান্তি সেন

Spread the love

কি দিয়ে শুরু করবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না তারপরও তো লিখা থামাতে পারছি না—-
এই তো সেদিন গত ৪ আগষ্ট সন্দীপ যখন অসুস্হ রাঙ্গাপিসুকে দেখতে ঢাকার পথে রওয়ানা হয় তখন বাসের সিটে বসে সেল্পি তুলে ফেসবুকে পোষ্ট দেয়-“Going to dhaka to see Rangapishu”!
সে ঘরে বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে চমৎকার ঢোল-খোল-নাল-তবলা বাজাতে
পারতো!তার বোন -সুস্মিতা ধর চৌধুরীর ‘র সাথে ফেসবুক লাইভে অনেক দর্শক তার তবলা সঙ্গতের প্রশংসা করেছেন!
আমি যার কথা বলছিলাম সে হলো মৌলভীবাজার রাজনগর থানার খলাগ্রামের ৭১’র মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ধর পরিবারের কিশোর সন্দীপ ধর চৌধুরীর কথা!
জন্মের পর সে অন্য সব শিশুর মত স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠলেও আড়াই বছর বয়সে তার শরীর খুব খারাপ হলে তাকে ডাক্তারের কাছে নেয়া হয় এবং রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ে তার টাইপ-১ ডায়বেটিস!
এরপর থেকে সন্দীপের শরীর সুস্হ রাখার জন্য শুরু হয় তার ইনসুলিন গ্রহণ!
গত ৩০ এপ্রিল সন্দীপ ফেসবুকে ছবিসহ একটি পোষ্ট দেয় –
” আমাকে বাঁচানোর একমাত্র কারণ হচ্ছে আমার এই ইনসুলিন।এই ইনসুলিন দ্বারা আমি আজ এই পৃথিবীর আলো বাতাস দেখতে পাচ্ছি… প্রতিদিন ২ বার করে অথবা ডায়বেটিস বাড়ানো থাকলে ৩ বারও ইনসুনিল দিতে হয়।এই ব্যাথা যন্ত্রণা আমাকে আর কতদিন কষ্ট দিবে!এখানে ৩ বছরের ঔষধ ও সুই জমা করেছি..!আপনার আমার জন্য আশির্ব্বাদ ও দোয়া করবেন যাতে এই ইনসুলিন থেকে যাতে আমি মুক্তি পাই!”
সন্দীপ মৌলবীবাজার কলেজে বি এ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।তার জন্ম ২৬ শে অক্টোবর ২০০১
এই তো সেদিন মানে গত ১১আগষ্ট সে ফেসবুকে পোষ্ট দেয় তার হৃদয়ের খুব গভীরে থাকা যাকে সে খুব মিস করে সে আমেরিকা প্রবাসী কাকা বুদ্ধ চৌধুরী ও কাকীমনি মৌটুসী দামের শিশু পুত্র শ্রাবণের কথা!সে নিজে ও সবার কাছে আশির্ব্বাদ চেয়েছে যাতে বড় হয়ে শ্রাবণ ইঞ্জিনিয়ার হয়!
গত ৪ ঠা জুলাই সে ফেসবুকে সচিত্র একটা পোষ্ট দেয় যেখানে লিখা ছিল-“এই প্রিয় মানুষগুলো আমাদের মধ্যে আর বেঁচে নেই।সবাই পরপারে ভালো থাকবেন 🙏🙏🙏🙏🙏”।
২৫ শে জুলাই সে ফেসবুকে তার রাঙ্গাপিসুর দ্রুত সুস্হতা কামনা করে একটি সচিত্র পোষ্ট দেয় যিনি তখন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে আইসিইউতে ছিলেন!
ফেসবুকে গত সপ্তাহে হয়তো ছবিসহ তার সর্বশেষ পোষ্ট ছিল এটি যেখানে সে লিখে-” সবার আশির্ব্বাদ,প্রার্থনা ও দোয়ায় একটানা ২০দিন পর —হসপিটাল থেকে আমাদের রাঙ্গাপিশু আজ বিকাল ৫.৩০ মিনিটের সময় বাসায় আসেন।…সবাই আশির্ব্বাদ ও দোয়া করবেন যাতে তিনি পুরো সুস্হ হয়ে যেতে পারেন।”
তার এই বৃদ্ধ রাঙ্গা পিসু যখন হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেন তখন তিনি ঠিকমত উঠে দাঁড়াতে পারতেন না এবং তাঁর সেবায় সন্দীপ বাড়ি না ফিরে ঢাকায় অবস্হান করে!
এরপর সেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে যায় এবং তাকেও ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়!তখন তার আত্মীয় স্বজন সন্দীপের আই সিই ইউ’র ছবি দিয়ে পোষ্ট দেন!
অতঃপর সব জল্পনা-কল্পানার অবসান ঘটিয়ে ১৯ শে আগষ্ট রাতে মাত্র ২২ বছর বয়সে সন্দীপ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে! তার ছোট্ট একটা জীবনে সে ইনসুলিনের আঘাতে আঘাতে প্রতিদিন রক্তাক্ত হয়েছে- অনেক অনেক কষ্ট করেছে! বিধাতা হয়তো সন্দীপের কষ্টদায়ক জীবন ও আর্তনাদ শুনে তাকে দ্রুত নিজের কাছে নিয়ে গেলেন!
যে মানুষটি সবাইকে আনন্দ ও সেবা দেবার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে এবং একরাশ আনন্দ নিয়ে ৪ আগষ্ট ঢাকার বাসে চড়ে সে ২০ শে আগষ্ট প্রত্যুষে একদম প্রাণহীন লাশ হয়ে বাড়ি ফিরে!
সন্দীপের মৃত্যুর পর রাজনগরের জনৈক মহিদুর রহমান নিজের ফেসবুক ষ্ট্যাটাসে লিখেন-” একটি পরিবারের উপর ‘৭১এ চালানো হয়েছিল ভয়াবহ হত্যাকান্ড…….সর্বশেষ গত উনিশ আগষ্টে ডেঙ্গু কেড়ে নিল এ পরিবারের এক নিষ্পাপ কিশোর সন্দীপের প্রাণ!..এই কিশোর লেখাপড়ার পাশাপাশি গাইতে পারতো,বাজাতে পারতো!…তার অকাল মৃত্যুতে আমাদের মুন্সিবাজারের বাতাস ভারী-ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলে শোকাভিভুত।..”
সন্দিপের শিক্ষক বিকাশ ধর তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন-“কি অমায়িক ব্যবহার, দেখা হলেই বলতো কেমন আছেন স্যার, তাদের বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান থাকলে তাকে সব সময় ব্যস্ত দেখতাম,শত ব্যস্ততার ফাঁকেও এসে খোঁজখবর নিত কিছু লাগবে কি না! তার অভাব আর কোনদিন কোন কিছু দিয়ে পূরণ করা যাবে না।…নিজে কষ্ট করেও সবাইকে খুশী রাখার চেষ্ঠা করতো…..।
(আমার এই লিখাটিতে সব ধরণের তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন সন্দীপের ভগ্নিপতি শ্রী সঞ্জয় দেব।)
২০ আগষ্ট
মিশিগান ইউএসএ