ঘুরে দাঁড়াতে চায় সেতু
সেতু তালুকদার সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার চান গ্রামের বাসিন্দা। পিতা ক্ষীতিশ রঞ্জন তালুকদার একজন কৃষক ছিলেন। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ত্রিশ বিঘার অধিক কৃষিজমি নদীগর্ভে এক সাথে বিলীন হয়ে গেলে সর্বশান্ত হোন ক্ষীতিশ তালুকদার। বসত ভিটা ছাড়া আর কিছুই রইল না, নদীর ভাঙ্গনের সাথে একান্নবর্তী পরিবারও অভাবগ্রস্থ হয়ে ভাঙ্গনের শিকার হয়।
মানসিকভাবে ভারসাম্য হারান সর্বস্বান্ত কৃষক ক্ষীতিশ। রোগে শোকে শরীরের ওজন বেড়ে যায়। নদীতে সিনান করা গ্রামের মানুষের সহজাত স্বভাব। ক্ষীতিশ তালুকদার ভারী শরীর নিয়ে নদীর জলে ডুব দিতে গিয়ে মাছ ধরার জালে আটকা পড়ায় সলিল সমাধি হয়। অনেক খোঁজাখুঁজি করে দুই দিন পর লাশ হয়ে ভেসে উঠেন ক্ষীতিশ।
মাথার উপর একমাত্র ছাতা মারা যাওয়ায় ছাপটা ঘরের শতছিদ্র দিয়ে অভাব অনটন দারিদ্র্যতা যেন প্রতিযোগিতা করে ঘর ভরিয়ে দিলো।
সেতুর সব বড় বোন সে সময় কুমিল্লা বোর্ড থেকে বিজ্ঞান বিভাগে চারটি বিষয়ে লেটার মার্কসসহ এসএসসি পাশ করেন। সেতুর সে বোন তাদের গ্রামের প্রথম মেয়ে যে কিনা বিজ্ঞান বিভাগে পড়েছেন এবং চারটি বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়েছেন।
সেতুর সেই দিদি ব্রাকে চাকুরী করতে সন্তান সম্ভবা থাকাকালে চাকুরী থেকে বিদায় নেন। আরেক বোন এমএ। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে সোতু সবার ছোট। বড় ভাই, বোনেরা সবাই বিবাহিত। অর্থাভাবে তাদের কারো জীবনই ফুল হয়ে ফুটে ওঠেনি।
পরিবারের ছোটো সন্তান সেতুও পড়ালেখায় যথেষ্ট মেধাবী। ক্ষুধার পেটে পাথর বেঁধে দিন কাটিয়েছে। সে দিনের ধরন এখনো আগের মতই আছে। সেতু অ আ ক খ থেকে শুরু করে গণিতে অনার্স পর্যন্ত পড়েছে। মাস্টার্সে ভর্তির পয়সাটুকু যোগাড় করতে না পাড়ায় আর পড়ালেখা এগুতে পারেনি।
কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারী হলে তাতে আবেদন করতেও টাকা লাগে। ছবি ওঠা, কাগজপত্র ফটোকপি করা, পে-অর্ডার, মানি অর্ডার, রিটার্ন টিকেটযুক্ত খাম, পোস্টিং খরচসহ আরো কত কি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় যখন পরীক্ষা দিতে হয় ঢাকা গিয়ে। ঢাকায় আত্মীয়-স্বজন পয় পরিচিত না থাকায় পরিবহন ব্যয়, হোটেলে থাকা খাওয়া আরো বড় বিড়ম্বনা।
সেতুর মা গ্রামের বাড়ীতে থাকেন। এবেলা ওবেলা খেয়ে না খেয়ে ক্ষুধার পেটে আলসার বাসা বেঁধেছে বেশ কয়েক বছর ধরে। মাকে বাড়ী থেকে শহরে এনে ভালো ডাক্তরের সিরিয়াল পেতেও টিকেটের লাইন বন্ধ আর খোলা থাকলে বিজি। কল সৌভাগ্যে রিসিভ হলে শোনা যাবে এই তিন মাসের মধ্যে সিরিয়াল নাই।
সেতু এখন সিলেট শহরে থাকে। তার জীবনের কোনো সাধ আহলাদ নেই। একটাই সাধ একটা ভালো চাকরী পেলে মায়ের সেবা করা।
জন্মদাত্রী মায়ের সেবাশুশ্রূষা করতে না পারা সেতুর কাছে কৈলাশবাসী মায়ের আগমনে মনে কোনো আনন্দ আহলাদ আগ্রহ নেই। পূজা উপলক্ষে নতুন কাপড় কেনার কোনো পরিকল্পনা নেই। মায়ের নতুন কাপড় কেনার চেয়ে নতুন ঔষধ কেনার প্রয়োজন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
মহালয়া হলে পূজার দিন গোণা শুরু হয়ে যায়। সনাতনীরা ব্যস্ত হয়ে যান কেনাকাটায়। সেতু বসন নয় স্বপ্নও দেখে না, এখন আর। দশভূজা দূর্গার দশ হাতের মধ্যে আশীর্বাদের একটা হাতও সেতুর জন্য নয়। জন্মদাত্রী মায়ের আশীষ তাকে ছায়া দিবে আজীবন, এই তার বিশ্বাস।।
ধ্রুব গৌতম, সিলেট।
