স্বর্গরাজ্য হিমাচলের ডায়েরী
প্রণব কুমার ধর
কৈলাসহর, ত্রিপুরা,ভারত
বর্ষার শেষে মেঘবৃষ্টির লুকোচুরি খেলার মাঝে মাঝে কটকটে রোদ্দোজ্বল নীল আকাশে সাদা সাদা পেঁজা তুলার মত মেঘের আনাগোনা প্রকৃতিতে কানপাতলে শোনা যায় শরতের পদধ্বনি। বাতাসে হিমেল আমেজ শরৎ ভ্রমনপ্রিয় বাঙ্গালীদের মনে এক অন্য মাত্রা এনে দেয়। বর্ষার বিদায় ও শরতের আগমন ভ্রমনপ্রিয়দের শ্রেষ্ট সময় । আর ভ্রমনপিপাসু মানুষের কাছে ভারতবর্ষ এক বিষ্ময়খনি যার রুপ ও ভাব চিরবৈচিত্র। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, একদিকে ধূধূ মরুপ্রান্তর রাজস্থান আরেকদিকে বর্ষাবন মেঘের রাজ্য মেঘালয়, একদিকে লাক্ষাদ্বীপপুঞ্জ, আন্দামানদ্বীপপুঞ্জ, লাদাখ মালভূমি, কত নদী, সাগর, হ্রদ ,পাহাড়, অরন্য, সারা উত্তরপ্রান্ত জুড়ে ধ্যানমগ্ন হিমালয় সাধুসন্ত ঋষিদের তপভূমি অসংখ্য দুর্গম তীর্থক্ষেত্র যার টানে যুগযুগ ধরে ছুটে চলে হাজার হাজার পূন্যার্থী। একই দেশ এত রুপ যার বৈচিত্রতার শেষ নেই তাই পর্যটকদের কাছে ভ্রমনের জন্য ভারত এক বিষ্ময়কর মনিমুক্তা ছড়ানো রত্নভান্ডার। আমি এই রত্নভান্ডার থেকে যে সামান্য অংশ আহরনের চেষ্টা করেছি তা আমার কাছে এক স্মৃতির মহাভারত। এই মহাভারত থেকে স্বর্গরাজ্য হিমাচলের সিমলা, কুলু মানালি ভ্রমনের কিছু স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে ভাগ করে নেব। লিখতে গিয়ে অনেক তথ্য আমার অর্ধাঙ্গীনি মিতালীর হিমাচল ভ্রমনের ডায়েরী থেকে পেয়েছি তারজন্য মিতালীর একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য।
২০১৭ সালের মে মাসের গ্রীষ্মকালীন অবকাশের এক অলস দুপুরে উদ্দেশ্যহীন ভাবে মোবাইলে “মেইক মাই ট্রিপে” বিমান ভাড়া দেখছিলাম। হঠাৎ নজরে পড়ল সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ আগরতলা কলকাতা রুটে খুব সস্তায় বিমানের টিকিট দিচ্ছে। কোন চিন্তা ভাবনা না করে দুটি টিকেট কেটে নিলাম, দুজনের মোট ভাড়া পড়ল ১৮৫০ টাকা। তারপর মিতালীকে নিয়ে সিমলা, কুলু মানালি ট্রিপের প্ল্যান করলাম। প্রায় প্রতিবছর আগষ্ট সেপ্টেম্বর মাসে বিভিন্ন রুটে বন্যার জন্য রেল পরিসেবা বিঘ্নিত হয় তাই রিক্স না নিয়ে সেপ্টেম্বরের ২ তারিখ কলকাতা চন্ডিগড় ভায়া জয়পুর বিমানের টিকিট কেটে নিলাম, ভাড়া পড়েছিল জনপ্রতি প্রায় পাঁচ হাজার টাকার মত। তারপর প্ল্যান মত যাবতীয় রেল,বাস,বিমানের টিকিট ও হোটেল বুক করে নিলাম যাতে কোন অসুবিধা না হয়।
কিভাবে সিমলা যাবেন
ত্রিপুরা থেকে আপনার সুবিধা অনুযায়ী বিভিন্ন উপায়ে যেতে পারেন। যদি বিমানে যান তবে আগরতলা থেকে দিল্লী সরাসরি বিমানে এসে বাসে সিমলা নয় ঘন্টার জার্নি। কাশ্মীরি গেট ISBT বাস আড্ডা থেকে ডিলাক্স, ভলভ, বা সাধারণ বাস পেয়ে যাবেন। দিল্লী টারমিনাস ৩ এ যদি আপনার ফ্লাইট আসে তবে টারমিনাস ৩ মেট্রো স্টেশন থেকে নিউ দিল্লী রেল স্টেশনে এসে বিকাল ৫টায় শতাব্দী এক্সপ্রেস এ রাত ১১টায় কালকা পৌঁছে পরের দিন সকালের ট্রেনে সিমলা। তবে আমার মতে নিউ দিল্লী স্টেশনে থেকে পুরাতন দিল্লী স্টেশনে চলে আসুন , রাত ৯টা ১০ মিঃ নেতাজী এক্সপ্রেস ধরে কালকা ভোর ৩টায় পৌঁছে সবার সাথে স্টেশনের প্লেটফরর্মে সামনের দিকে হেঁটে এসে দেখবেন আপনার জন্য সিমলার কয়েকটি টয় ট্রেন আপেক্ষা করছে।
আগরতলা থেকে কলকাতা ফ্লাইটে এসে হাওড়া স্টেশন থেকে রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে নেতাজী এক্সপ্রেস ধরে কালকা পৌঁছাতে পারেন। আবার ত্রিপুরা থেকে ট্রেনে দিল্লী এসে সুবিধামত সিমলা আসতে পারেন।
একটু বলে রাখি সিমলার টয় ট্রেন ভ্রমনের মজাই আলাদা। পথে পড়ে ছবির মত সাজানো সব পাহাড়ী স্টেশন , ১০২টি টানেল পেরিয়ে সিমলা পৌঁছাতে সময় লাগে ৫ ঘন্টা৩০মিনিটের মত। ভারতীয় রেলের IRCTC অ্যাপ এ এই রুটে যাত্রার ১মাস আগে টিকিট ওপেন হয় তাই সাথেসাথে টিকিট কেটে নেবেন নতুবা টিকিট পাওয়া মুসকিল। ভারতের খুব কম রুটে রেলমটর পাবেন , এ রুটে মোট ১৪ আসনের রেলের চাকা লাগানো একধরনের ডিলাক্স বাস রেল লাইনের উপর দিয়ে যাতায়াত করে যাকে বলা যেতে পারে রেলমটর, ভোর ৫টা ২৫ মিনিটে সিমলার উদ্দেশ্যে দিনে একবার ছাড়ে। মাত্র একটি স্টেশনে (বড়োগ) দাঁড়ায়, সিমলা পৌঁছতে সময় নেয় ৪ ঘন্টা ৩০মিনিট। রেল মটরে ছাড়াও আরো অনেক ট্রেন আছে আপনার সুবিধা অনুযায়ী টিকিট কেটে রাখতে পারেন। এছাড়াও কালকা থেকে সিমলার অনেক বাস পাবেন,সময় লাগে ৩ ঘন্টার মত। তাছাড়া আগরতলা থেকে চন্ডিগড় পর্যন্ত বিমানে এসে বাসে বা কালকা থেকে বাসে/ট্রেনে সিমলা আসতে পারেন ।
একটু বলে রাখি সিমলা ভ্রমনের সবচেয়ে ভাল সময় হল অক্টোবর মাস, এসময় আকাশ থাকে মেঘমুক্ত, ঠাণ্ডা ও থাকে সহনশীলতার মধ্যে। তবে আপনি স্নোফল উপভোগ করতে চাইলে তবে জানুয়ারী ও ফেব্রুয়ারি আদর্শ মাস,যদি গাছ ভর্তি পাকা আপেল দেখতে চাইলে আগষ্ট/সেপ্টেম্বর মাসে যেতে পারেন তবে আগষ্ট মাসে বৃষ্টি জন্য কিছু আনন্দ বিঘ্নিত হতে পারে। আমার মতে বর্ষার সিজন এড়িয়ে যে কোন সময় যেতে পারেন।
প্রতীক্ষার অবসান
এসে গেল আমাদের প্রতিক্ষীত যাত্রার দিন। ১লা সেপ্টেম্বর রাত ৭টা ৪০মিনিটের ইন্ডিগো বিমানে আগরতলা থেকে চলে এলাম দমদম তখন ঘড়িতে রাত ৮টা ৩০মিনিট। লাউন্সের বাইরে এসে দেখি কোথায় ও যাওয়ার উপায় নেই। ঝড়ের দাপটে ওলা , উবের টেক্সী সব উদাও। যাব টালিগঞ্জ আমার এক আত্মীয়ের বাসায়, হঠাৎ ভাগ্যক্রমে এয়ারপোর্ট থেকে টালিগঞ্জের ভলভ বাস পেয়ে চলে এলাম আত্মীয়ের এখানে। পরেরদিন অর্থাৎ ২রা সেপ্টেম্বর রাত ৯টায় জয়পুরের ফ্লাইট, সময়মত চলে এলাম এয়ারপোর্ট। যথাসময়ে ইন্ডিগো বিমান আমাদের নিয়ে ডানা মেলে চললো জয়পুরের উদ্দেশ্যে। নিকেশকালো অন্ধকার আকাশে তারার মিটমিটি আলো আর নিচে আলোর ঝলমলে তিলোত্তমা কলকাতা নগরীকে লাগছিল যেন স্বপ্নপুরী । এভাবে নাম না জানা নানা আলো ঝলমলে নগরীর উপর দিয়ে উড়তে উড়তে রাত ১১টা ২০ মিনিটে আমাদের বিমান জয়পুরের মাটি স্পর্শ করল। পরেরদিন সকাল ৬টা২৫মিনিটের স্পাইসজেটের চন্ডিগড়ের টিকিট আমাদের তাই রাতটা জয়পুরের লাউন্সে কাটিয়ে দিলাম। ভোরে সিকিউরিটি চেকের পর স্পাইসজেটের বাস একটা দুইপাখার ছোট বিমানের সামনে নামিয়ে দিল। এধরনের ছোট বিমানে আমার প্রথম যাত্রা। দুজন অল্পবয়সী সুন্দরী পাইলট যেন স্বর্গের দেবকন্যা নীল আকাশ আর মেঘের মধ্যে লুকোচুরি খেলতে খেলতে আমাদের বিমানকে চন্ডিগড় এয়ারপোর্টে নিয়ে এল তখন ঘড়িতে বাজে সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট।
চন্ডিগড়
এয়ারপোর্ট লাউন্স থেকে বেরিয়ে চন্ডিগড় এয়ারপোর্টের বাস স্টপ থেকে ভলভ বাসে চলে এলাম চন্ডিগড় বাস টরর্মিনাসে (ISBT) । সময় থাকলে একটি অটো বা গাড়ী নিয়ে চার ঘন্টায় দেখে নিতে পারেন চন্ডিগড়ের বিখ্যাত ট্যুরিষ্ট স্পট জাকির হোসেন গোলাপ বাগান, রক গার্ডেন, সুকনা লেক, ডলস মিউজিয়াম ইত্যাদি। চন্ডিগড়ের ট্যুরিষ্ট স্পটগুলি আমারা আগেই ঘুরেছিলাম তাই আমরা চন্ডিগড় বাস টরর্মিনাস থেকে বাসে ২৭ কিমি দূরে কালকা চলে এলাম।
কালকা
ছাত্রজীবনে কালকার উপর দিয়ে বহুবার যাতায়াত করেছি, বন্ধুদের সাথে কালকার বিখ্যাত পিঞ্জোর গার্ডেনে ও ঘুরেছি কিন্তু রাতে এই গার্ডেনের লাইটিং দেখার সুযোগ হয়নি তাছাড়া রেলমটরে সিমলা ভ্রমনের সুপ্ত বাসনা মনের মধ্যে ছিল। তাই ঠিক করেছিলাম কালকায় এক রাত থাকব এবং সেই মত প্ল্যান অনুযায়ী আগেই ৪ তারিখের রেলমটরের টিকিট কেটে নিয়েছিলাম সাথে “মেইক মাই ট্রিপে” থেকে স্টেশনের কাছে হোটেল কৃষ্ণায় একটা ডাবল সিটের রুম (DAB) বুক করে রেখেছিলাম। কালকার বাস স্টপ থেকে একটা অটো নিয়ে চলেএলাম হোটেল কৃষ্ণায়। সারা রাতের জার্নির দখল তাই হোটেলে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে দুপুর ১২টায় পাশের একটা ধাবায় লাঞ্চ সেরে হোটেলে এসে একটু ঘুমিয়ে নিলাম। বিকাল ৪টায় ঘুম ভাঙ্গল পর দেখি শরীরের সমস্ত ক্লান্তি ও অবসাদ কেটে গেছে । তারপর তৈরী হয়ে বিকাল ৫টায় একটি আটো নিয়ে চলে এলাম আট কিমি দূরে চণ্ডিগড়ের পথে হিমালয়ের পাদদেশে ১৭শতকে নবাব ফিদাই খান কোকার তৈরী ১০০ একর জায়গা নিয়ে পিঞ্জোর গার্ডেন যা পরবর্তী সময় পাতিয়ালার মহারাজা যাদবেন্দ্র সিং নবরুপ দান করেন যার বর্তমান নাম যাদবেন্দ্র গার্ডেনে। বাগানে প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ২০টাকা। সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এই বাগান ৭টি স্তর, প্রথম স্তরে শিশ মহল ও হাওয়া মহল, দ্বিতীয়টিতে অনিন্দসুন্দর খিলানো দরজা, তৃতীয়টিতে নানা প্রজাতির রংবেরংঙ্গের ফুলের সমাহার, চতুর্থটিতে জলমহল, পরবর্তী দুটিতে নানাবিধ গাছের বাগান, সপ্তম স্তরে মুক্তমঞ্চে যেখানে মুঘল আমলে নৃত্যগীত ও নানাবিধ অনুষ্টান হতো তাছাড়া ঘাসের বিছানো মখমলের গালিচা, ঝরর্না ইত্যাদিতে এই বাগান এক অনন্য সৃষ্টি । সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে শুরু হল নানা রং এর আলোর খেলা, মূহূ্র্তে মূহূ্র্তে ঝরর্না , বিভিন্ন মহল, জল ,গাছ ইত্যাদির রং পালটাতে থাকে ও সারা বাগান জুড়ে চলতে থাকা আলোর বন্যায় হয়ে উঠে মায়াবী স্বপ্নপুরী। দেখতে দেখতে কখন যে রাত ৯টা বেজে গেল টেরই পেলাম না। পিঞ্জোর তথা যাদবেন্দ্র গার্ডেন থেকে বেরিয়ে অটো নিয়ে বিশাল যানজট পেরিয়ে এক ঘন্টায় চলেএলাম হোটেলে। আগামীকাল ভোরের রেলকারে যাব সিমলায় তাই ডিনার সেরে চলে গেলাম নিদ্রাদেবীর কোলে।
সিমলার পথে
ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে রেলের app এ আমাদের রেলকারের যাত্রার টাইম চেক করতে দেখি সকাল ৮টায় ছাড়বে। সকালে স্টেশনে গিয়ে জানতে পারলাম নেতাজী এক্সপ্রেস লেইটে চলছে ও দেরীতে এসে পৌঁছবে তাই সিমলার সব ট্রেনই দেরীতে ছাড়াবে । সাধারণত নেতাজী এক্সপ্রেস সহ অন্যান্য ট্রেনগুলি কালকায় পৌঁছাতে দেরী হলে সিমলার যাত্রীদের জন্য ঘন্টা দু এক অপেক্ষা করে সিমলার ট্রেনগুলি ছাড়ে। আমাদের রেলমটর কালকা মেলের জন্য অপেক্ষা করে তিন ঘন্টা দেরীতে ছাড়ল সকাল ৮টা ৩০মিনিটে। এই সর্পিল পাহাড়ী পথ বেয়ে আমাদের রেলমটর ছবির মত সুন্দর ঝকঝকে অনেকগুলি স্টেশন পেরিয়ে এসে থামল বড়োগ স্টেশনে, ড্রাইভার চা বিরতির জন্য সময় দিল ১৫ মিনিট। একে একে অনেকগুলি স্টেশন পেরিয়ে যখন গাড়ী হিমাচলপ্রদেশ ইউনিভারসিটির স্টেশন সামারহিল ক্রস করল তখন আমাকে যেন নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসল, আমার জীবনের শ্রেষ্ট সোনালী দুটি বছর কেটেছে এই ইউনিভারসিটিতে। চলে যাই একটু প্রসংঙ্গান্তরে, আমার ছাত্রজীবনে এই স্টেশনের স্টেশনমাস্টার ছিলেন তখন কলকাতার এক বাঙ্গালী ভদ্রলোক কৃষ্ণকমল বিশ্বাস উনাকে বিশ্বাসদা বলে ডাকতাম। আমরা চারজন ছিলাম বাঙ্গালী স্টুডেন্ট, ত্রিপুরার তিনজন আর আন্দামানের একজন। স্টেশন লাগোয়া উনার কোয়ার্টারে ছিল আমাদের অবাধ যাতায়াত । বাড়ি থেকে বহুদূর বিদেশ বিভূই বৌদির (বিশ্বাসদার স্ত্রী) নিকট থেকে পেয়েছিলাম মাতৃস্নেহ, উনাদের কাছ থেকে যে স্নেহভালোবাসা পেয়েছিলাম তা আমার স্মৃতির মনিকোটায় চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে। এখনও মাঝেমাঝে মুটোফোনের কল্যানে দাদাবৌদির সাথে স্মৃতির রোমন্থন করি তখন টাইম মেশিনে চলে যাই চল্লিশ বছর আগের জীবনে । এবার আসি আমার ভ্রমন প্রসংঙ্গে, সামারহিল থেকে চার কিমি দূরে মোট ১০২টি টানেল পেরিয়ে দুপুর ১টায় এসে আমাদের গাড়ী পৌঁছল সিমলা স্টেশনে।
সিমলায় কোথায় থাকবেন
সিমলায় থাকার জন্য বিভিন্ন মানের বহু হোটেল পাবেন । চলাফেরায় সুবিধার জন্য ম্যাল রোডের কাছাকাছি হোটেল নিলে ভালো হয় । মিডিল বা লোয়ার বাজার এলাকায় হোটেল নিলে চড়াই উৎরাই হাঁটতে গিয়ে পা ধরে যায়। Goibibo বা MakeMyTrip থেকে বুকিং করলে রিভিউ দেখে করবেন। সিমলা কষ্টলি জায়গা, সাধারণ মানের হোটেল ভাড়া ২০০০/২৫০০ টাকার মত হবে । সিমলায় জলসংকট সাংঘাতিক, হোটেলগুলিতে অনেক সময় আগে কিছু বলে না রুম নেওয়ার পর হয়ত দেখলেন জনপ্রতি এক বাকেট করে জল বরাদ্দ করেছে। তবে আমার মতে সিমলায় বাঙ্গালীদের থাকা ও খাওয়ার জন্য সিমলার প্রাইম লকেশনে সর্বোত্তম জায়গা হল সিমলা কালীবাড়ী। পরিষ্কার পরিছ্ন্ন রুম, ২৪ ঘন্টা জল ও সকালে গরম জলের ব্যবস্থা , সিমলার রীজ ও ম্যাল রোড অতি কাছে হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত। দুর্গাপূজার সময় পিক সিজনে গেলে অন্ততপক্ষে যাত্রার দুমাস আগে বুক করুন নতুবা রুম পাওয়া দুষ্কর।
সিমলা কালীবাড়ীতে সর্বোচ্চ ১০ দিন পর্যন্ত থাকা যায়। রুম বুক করার নিয়ম হল তারিখ উল্লেখ করে কবে থেকে কত তারিখ পর্যন্ত থাকবেন, কি ধরনের রুম (ডাবল-DAB) / ত্রিপল-TAB) সিটের বাথরুম সহ বা ডনমেটরী লাগবে তা জানিয়ে লিখতে হবে simlakalibari.1823@gmail.com কালী বাড়ীর email এর ঠিকানায়। কালীবাড়ীর পক্ষ থেকে এই তারিখগুলিতে রুম দেওয়া যাবে কি না আপনাকে জানানো হবে। যদি হাঁ হয় তবে কত টাকা অগ্রিম পাঠাতে হবে তা জানিয়ে এবং তাদের ব্যাংকের নাম ও Account no. আপনাকে পাঠিয়ে দেবে। অগ্রিম টাকা পাওয়ার পর রুম তারা বুকিং করে রাখবে। DAB রুম ভাড়া ৫০০ টাকা , TAB রুম ভাড়া ৬০০ টাকার মত পড়ে। রুমেTV ছাড়া সাধারণ সব সুবিধাই আছে। কালীবাড়ীর ডাইনিং হলে মাছ, ডিম, মাংস মিল ৫৫ টাকা থেকে ১০০টাকার মধ্যে পাবেন। থাকা ও খাওয়ার জন্য এর থেকে সস্তা ও ভালো ব্যবস্থা সিমলায় কোথায় ও পাবেন না। রুম বুকিং এর আগে কালিবাড়ীর এই +91-0177-2652964 ফোন নং এ কথা বলে নিন।
সিমলা
সিমলা রেলস্টেশন থেকে কালীবাড়ির দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার । রীজ,ম্যাল রোড সহ কালীবাড়ী অঞ্চলে গাড়ী চলাচল নিষিদ্ধ তাই স্টেশন থেকে দরদাম করে ২০০টাকা দিয়ে কুলি ঠিক করে হেঁটে চড়াই ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে চলে এলাম কালীবাড়ী। যারা চড়াই রাস্তা হেঁটে আসতে পারবেন না তারা স্টেশন থেকে গাড়ী ভাড়া করে চলে আসুন AG Chowk কাছে ডালজিল হোটেলের নিকট, সাধারণত গাড়ী এখানেই নামিয়ে দেবে এবং এখান থেকে প্রায় ১০০ মিটার হেঁটে চড়াই ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে সোজা চলে যাবেন কালীবাড়ি।
কালীবাড়ীর রুমে ঢুকে মনটা আনন্দে ভরে গেল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রুম, দুদিকে গ্রীলে ঘেরা কাচের দেওয়াল আর চোখের সামনে সারা সিমলা শহর, দূরে পাহাড়ের চুঁড়ায় জাকু মন্দিরের ১০৮ ফুট উঁচু হনুমানের বিশাল মূর্তি স্পষ্ট দৃশ্যমান। এরমধ্যে গ্রীলের বাইরে সপরিবারে হনুমানেরদল এসে আমাদের ভেংচি কেটে স্বাগত জানিয়ে গেল। একটু বলে রাখি বাইরে যাওয়ার সময় জানালা খোলা রেখে যাবেন না কারণ উনারা হাতের নাগালে যা পাবে সব নিয়ে যাবে। একটু রেষ্ট নিয়ে স্নান সের গিন্নি গেলেন কালিমন্দিরে পূজা দিতে । পূজার পর কালিবাড়ির ডাইনিং হলে আমরা দ্বিপ্রাহরিক আহার সেরে নিলাম।
বিকাল ৪ টায় বেরিয়ে পড়লাম রীজ ও ম্যাল রোডের উদ্দেশ্যে। কালীবাড়ীর গেইটর ডানদিকে প্রায় সমতল রাস্তা হাঁটতে হাঁটতে ৫ মিনিটে চলে এলাম স্ক্যাণ্ডাল পয়েন্ট। একটু ইতিহাসে ফিরে যাই, এক সময় বৃটিশদের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী ছিল সিমলা, ভাইসরয় লর্ড কার্জনের সুন্দরী মেয়ে প্রতিদিন রীজ ও ম্যালে বেড়াতেন তখন ঐ সময় বৃটিশ ছাড়া কোন ভারতীয়রা এখানে প্রবেশ করতে পারতো না। একদিন পাতিয়ালার মহারাজা ভূপিন্দর সিং ঘোড়ায় এসে লর্ড কার্জনের মেয়েকে এখান থেকে অপহরণ করেন তাই এই স্থানটির নাম স্ক্যাণ্ডাল পয়েন্ট । এর ডান দিকে বিশাল বিশাল দোকানপাট নিয়ে ম্যাল রোড আর বামদিকে একটু এগিয়ে গেলে পাহাড়ের উপর বিরাট সমতল জায়গা নিয়ে রীজ, এখানে বিশাল উঁচু স্টেণ্ডে জাতীয় পতাকা পতপত করে উড়ছে যা সারা সিমলা থেকে দেখা যায়। এখানে ও ম্যালে মনের আনন্দে ঘুরুন প্রয়োজনে এখানে কাঠের বেঞ্চে বসে মিষ্টি মধুর রোদে শরীরকে চাঙ্গা করে নিন আর দূরের বরফে ডাকা পাহাড় উপভোগ করুন, কিভাবে সময় কেটে যাবে টেরই পাবেন না। স্ক্যাণ্ডাল পয়েন্ট লাগোয়া রীজের দিকে হিমাচল ট্যুরিজমের অফিসে (HPTDC) এসে ট্যুর সংক্রান্ত খবরাখবর নিয়ে চলে এলাম রীজে, এখানে ঘুরতে ঘুরত কিভাবে সময় কেটে গেল টেরই পেলাম না । যখন সূর্যাস্ত হল তখন ঘড়িতে ৮টা। সিমলা ভারতের প্রায় পশ্চিম প্রান্তে হওয়ায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেরীতে হয়। রীজ থেকে ম্যাল হয়ে আস্তে আস্তে চলে এলাম কালিবাড়ী। এসে দেখলাম বাদ্যযন্ত্র সহ নিত্য পূজা চলছে আর আমরা বসে রইলাম কালিবাড়ির চত্ত্বরে। মেঘমুক্ত আকাশে রাতের অন্ধকার নামার সাথে মনে হল সারা আকাশ যেন গ্রহ নক্ষত্র নিয়ে সিমলা পাহাড়ে হাজির হয়েছে ,অনতি দূরে পাহাড়ের চূড়ায় জাকু মন্দিরে আলোকসজ্জায় হনুমানের মূর্তীকে লাগছিল একটা আগুনের গোলা। আজ আর নয়, আগামীকাল স্থানীয় কোন কোন স্পটে কিভাবে যাব তা মনে মনে ঠিক করে একসাথে কালিবাড়ির ডাইনিং হলে ডিনার সেরে চলেএলাম আমাদের রুমে।
আজ ৫ তারিখ সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর দেয়াল ও জানালা থেকে পর্দা সরাতেই মনেহল রোদুস্নাত চিরযৌবনা সুন্দরী পাহাড়ের রাণী সিমলা যেন আমাদের জন্য আপেক্ষা করছে। আমরা আস্তে আস্তে স্নানটান সেরে তৈরী হয়ে কালিবাড়ীর গেইটে বাইরে বামহাতি রাস্তায় একটু ডাউন নেমে একটা ধাবায় দই সহযোগে আলুপরোটা দিয়ে প্রাতরাশ সেরে জাকু মন্দিরের উদ্দেশ্যে চলেএলাম রীজে অবস্থিত চার্চের কাছে।
জাকু মন্দির – একটু বলে রাখি, সারা সিমলা জুড়েই বানরকুলের রাজত্ব তবে তারা আনেকটা ভদ্র কিন্তু জাকুর বানরের মত এত শয়তান বানর ভূভারতে আর আছে কিনা সন্দেহ। তাই ব্যাগ, ক্যামেরা, চশমা,জুতা সাবধানে রাখবেন নতুবা একটু অন্যমনষ্ক হলেই জিনিস নিয়ে গাছের উপরে। তখন খাবার ছোঁড়ে দিলে পরে জিনিস ফেরৎ দেয়।
সিমলার বিখ্যাত জাকু মন্দিরে আপনি বিভিন্ন উপায়ে যেতে পারেন। যারা ট্রেকিং করতে চান তারা রীজে চার্চের পাশে জাকু মন্দিরের রাস্তা ধরে ২.৫ কিমি হেঁটে চলে যেতে পারেন । আবার জাকুর রাস্তায় ছোট গাড়ী ভাড়া করে নিতে পারেন। আনুমানিক ভাড়া ৬০০/৭০০টাকা চাইতে পারে, দরদাম করে টিক করে নেবেন। আমার মতে সস্তায় বেষ্ট অপসন হল চার্চের পাশে পুলিশ পয়েন্ট থেকে ১৫/২০ মিটার সামনে এগিয়ে গিয়ে একটু অপেক্ষা করুন HPTDC এর ছোট গাড়ির গায়ে “ Pride on Ride” লেখা দেখবেন । ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্টের এই গাড়ীগুলি জনপ্রতি ২০ টাকায় পৌঁছে দেয়, আবার একই ভাবে ফিরে আসুন। আমরা ও HPTDC এর ছোট গাড়িতে চলে এলাম জাকু মন্দিরে। মিতালি যেই বাইরের বিশাল হনুমানের মূর্তির সামনে জুতা খুলে প্রণাম করতে গেছে তখন মূহূর্তের মধ্য একটি বানর এক জুতা নিয়ে স্ট্যাচুর প্রায় ১২ ফুট উঁচু ভিতের উপর বসে রইল এরপর ২০টাকা দিয়ে এক পেকেট বাদাম ভাজা কিনে ছোঁড়ে দেওয়ার পর ডিল দিয়ে জুতা ফেরৎ দিল। জাকু মন্দিরে হনুমানজী ও লাগোয়া সিদ্ধবাবা বালকনাথ মন্দির দর্শন করে ফেরার সময় এক বড়সড় এক বানর আমার পেছন থেকে এক লাফে ঘাড়ে উঠে চোখ থেকে চশমা খুলে পাইন গাছের ডালে বসে আমাকে দেখছিল। তখন এক ভাজা বাদাম বিক্রেতা বল্ল আপনি চশমা লুফতে পারবেন না ২০ টাকা দিন আপনার চশমা ফেরৎ এনে দিচ্ছি। এই বিক্রেতার মাধ্যমে অবশেষে চশমা ফেরৎ পেলাম এবং মনে হল বাদাম বিক্রেতা ও এখানের বানরকুলের মধ্যে একটা অলিখিত চুক্তি আছে। এরপর জাকু দর্শন শেষে চলেএলাম স্ক্যাণ্ডাল পয়েন্টের কাছে ম্যাল রোডে ইন্ডিয়ান কফি হাউসে।
ভাইসরয় হাউসে(Indian Institute of Advance Studies)- কফি হাউস থেকে বেরিয়ে বামদিকে একটু এগিয়ে এলাম পুলিশ পয়েন্টের নিকট যাত্রীশেডে। এখান থেকে HPTDCএর “ Pride on Ride” ট্রেভেলার গাড়ীতে চলেএলাম ভাইসরয় হাউসে যার বর্তমান নাম Indian Institute of Advance Studies ভাড়া নিল জনপ্রতি ২০টাকা এরপর যাব আমার পুরাতন জায়গা হিমাচলপ্রদেশ বিশ্ববিদ্যালয়। আবার ছোট গাড়ী ৫০০/৬০০টাকা ভাড়া করে আসা যায় এখানে। Ola/Uber দেখতে পারেন যদিও এদের সংখ্যায় কম দেখেছি।
ভাইসরয় হাউসটি চৌড়া ময়দানের নিকট অবজারবেটরী হিলে অবস্থিত। বৃটিশ স্থপতি হেনরী আরুইন ধূসর রং এর পাথর দিয়ে ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের জন্য ঘাসের মখমল বিছানো ফুলের বাগানে ঘেরা ও ভিতরে আখরোট ও সেগুন কাঠের অনিন্দসুন্দর কারুকার্যমন্ডিত গ্রীষ্মকালীন আবাস তৈরী করেন যার নাম ছিল ভাইসরিগেল লজ্। লর্ড ডাফরিন থেকে লর্ড মাউন্টব্যাটেন পর্যন্ত এই গ্রীষ্মকালীন আবাসে ছিলেন। ১৯৪৫ সালের সিমলা কনফারেন্স, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এখানে গ্রহন করা হয় যার ফল এখন ও আমরা ভোগছি। ১৯৬৪ সালে এই বাড়িকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (IIAS) রুপান্তর করা হয়। কোন ট্যুরিষ্ট সংস্থা এই বাড়িটি দেখায় না, আপনাকে নিজ উদ্যোগে যেতে হবে। আমার মতে এটাই সিমলার বেস্ট দর্শনীয় স্থান, মিস্ করবেন না কেউ।
হিমাচলপ্রদেশ বিশ্ববিদ্যালয় (HPU)– IIAS এর মেইন গেইটে পেয়ে গেলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস, প্রায় ৩ কিমি দূরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্লকের কাছে নেমে গেলাম। পাইন ও দেবদারু গাছের ছায়াঘেরা পাহাড়ের ঢাল ও চূড়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের উঁচু উঁচু বিল্ডিং আর দূরে বরফে ঢাকা ধ্যানমগ্ন হিমালয়ের পিকগুলির পাগল করা সৌন্দর্যের মাঝে আমার ভালোবাসার শিক্ষানিকেতন। আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম বলে, তারজন্য অবশ্যই কৃতজ্ঞতা জানাই জগৎ প্রকাশ নাড্ডাজী ও সুনীল উপাধ্যায়জীকে। দুজনেই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের ছাত্র ও ছাত্রনেতা। ১৯৮৩ সালে গ্রেজুয়েশন শেষে Indian Express পত্রিকায় HPU এর ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দেখে আমি ও আমার এক বন্ধু শিশির দত্ত মাষ্টার ডিগ্রী করার জন্য চলেএলাম সিমলা। একজন স্থানীয় পুলিশের আমাদের একটি ধর্মশালায় তিনদিন থাকার ব্যবস্থা করে দেন। তিনদিন পর নাড্ডাজী ও সুনীলজী আমাদের নিয়ে আসেন তাদের হোস্টেলে। সুনীলজী উনার রুম ও বিছানা আমাদের জন্য ছেড়ে দেন, উনি চলে যান নাড্ডাজীর রুমে। প্রায় এক মাস ছিলাম উনার রুমে। প্রায়দিনই উনারা শিশির ও আমাকে নিয়ে যেতেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। উনাদের নিকট থেকে পেয়েছিলাম বড় ভাইএর স্নেহ ও ভালোবাসা। এই নাড্ডাজী বর্তমানে ভারতীয় রাজনীতির এক উজ্বল নক্ষত্র যিনি প্রধানমন্ত্রী মোদীজীর ডান হাত জে, পি, নাড্ডা নামে সবাই জানি।
এখন ফিরে আসি ভ্রমন প্রসংঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীর কাছে পেয়ে গেলাম আমার অতি পরিচিত আমার কমার্স বিভাগের সিনিওর দাদা ডঃ বিজয় শর্মাকে বর্তমানে তিনি এখানেই কমার্স বিভাগের প্রফেসর। এতবছর পর দেখেই চিনে ফেল্লেন আমাকে, পড়াশুনার ব্যপারে উনার সাহায্য পেয়েছি অনেক, নিয়ে গেলেন উনার চেম্বারে, চা পানের সময় কথা প্রসংঙ্গে বল্লেন ডঃ ঘনশ্যাম চৌহান কেমেষ্ট্রী বিভাগে অধ্যাপনা করেন, বিজয়জী বল্লেন ঘনশ্যামজীর সাথে দেখা করে যেতে। কেমেষ্ট্রী বিভাগের এক দিকপাল বাঙ্গালী প্রফেসর ছিলেন ডঃ বি,এন, মিশ্র উনার সাথে আমাদের ছিল খুবই সুসম্পর্ক। ঋষিতুল্য মানুষ উনি একাই থাকতেন, উনার কোয়ার্টারে ছিল আমাদের অবাধ যাতায়াত। উনার অধীনে ঘনশ্যামজী গবেষনা করতেন। যখনই বাইরের কোন প্রফেসর আসতেন কেমেষ্ট্রী বিভাগে তখন সিমলা ঘুরে দেখাবার দায়িত্ব পড়ত ঘনশ্যামজী ও আমাদের উপর। সেই সুবাদে ঘনশ্যামজীর সাথে আমাদের ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠে। ঘনশ্যামজীর সাথে দেখা করলাম উনার চেম্বারে গিয়ে,খুবই খুসী হলেন আমাকে পেয়ে কিছু স্মৃতিচারণ করে চলেএলাম আমার হোষ্টলের রুমে, যে রুমে দুবছর কাটিয়েছি একসময়। এই রুমে এসে পেলাম লাহুল স্পিতির দুজন আবাসিক ছাত্রকে তাদের সাথে কিছু কথাবার্তা বলে চলে এলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেম্পাসে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কত পরিবর্তন হয়েছে এই কেম্পাসের তাই ভাবছিলাম এমন সময় পেয়ে গেলাম সিমলার বাস। আমার ভালবাসার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেম্পাসকে মনে মনে প্রণাম জানিয়ে ফিরে এলাম কালিবাড়ীতে।
আউট সাইড সিমলা ট্যুর – পরেরদিন ৬তারিখ সকালে তৈরী হয়ে চলেএলাম স্ক্যাণ্ডাল পয়েন্টের কাছে HPTDC অফিসে আউট সাইড সিমলা ট্যুর করব বলে , অফিসের আধিকারিক জানালেন সিজন এখন ও ঠিকভাবে শুরু না হওয়ায় টুরিষ্টের সংখ্যা কম তাই তাদের টুরিষ্ট বাস ছাড়বে না এবং পরামর্শ দিলেন আমরা প্রাইভেট গাড়ীতে ঘুরে নিতে। HPTDC অফিসের বাইরে এক ড্রাইভারের সাথে দরদাম করে ১২০০ টাকায় অল্টো গাড়ী ঠিক করে বেরিয়ে পড়লাম ঘুরতে। প্রথমে গেলাম গ্রীন ভ্যালী , এরপর এলাম খুফরী, এখান থেকে ঘোড়ায় যাব ফাগু গ্রামে। অত্যন্ত কর্দমাক্ত দুর্গম এবড়খোবড় কর্দমাক্ত প্রায় ২কিমি রাস্তা একমাত্র ঘোড়া চলাচলের উপযোগী। ঘোড়ায় জনপ্রতি আসা যাওয়া বাবদ ৫০০টাকা করে গেলাম ফাগু। এখানের আপেল বাগান দেখতে ১৭৫ টাকা (জনপ্রতি) করে টিকিট করে অনেকখানি হেঁটে ডুকলাম বাগানে , দেখার মত কিছুই নেই । সিমলায় সেপ্টেম্বর মাসে গাছে খুব কমই আপেল থাকে , আগেই বাগান থেকে আপেল পেড়ে নেয়। অন্য সময় পাতা ঝরা খালি আপেল গাছ দেখবেন। বরং কুলু মানালীতে চলতে ফিরতে এমনিতেই গাছে প্রচুর আপেল দেখতে পাবেন সেপ্টেম্বর মাসে। এখানে এখন প্রতি পদক্ষেপে লোকঠকানোর ব্যবসা ফেঁদে বসেছে এরা। ছাত্রাবস্থায় এখানে এসেছি কয়েকবার তখন এমন লোকঠকানো ছিল না এখানে । ঘোড়ার মালিকদের ইনকামের জন্য মনে হল ইচ্ছাকৃতভাবে তারা এমন কর্দমাক্ত বাজে রাস্তা বানিয়ে রেখেছে যাতে কেউ হেঁটে না আসতে পারেন। শিশু ও মহিলাদের নিয়ে যাওয়ার আগে চিন্তা করুন, ঘোড়ার পিঠ থেকে কাদায় পড়লে পরিষ্কার করার জল ও পাবেন না এখানে। কুফরী থেকে চলে এলাম নালদেরাতে। পাইন বনের মধ্যে পাহাড়ের ঢালে সবুজ ঘাসের গালিছা বিছানো গল্ফ খেলার মাঠ। এই জায়গা চলচিত্রের শুটিং এর জন্য বিখ্যাত । মাঠের মাঝখানে নাগমাতার মন্দির। এখানে প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা। পাইন বাগানের ভিতর এন্ট্রি গেইট থেকে কয়েক মিটার এগিয়ে গেলে ডানদিকে ট্যুরিষ্ট কটেজের পাশ দিয়ে একটু আপ উঠে ৩০/৩৫ মিটার হেঁটে গেলেই গল্ফ গ্রাউন্ড ও পাইন গাছের ছায়াঘেরা সুন্দর স্পট। এখানেও ঘোড়াওয়ালারা ঘুরপথে কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে নিয়ে আসবে এখানে। এই স্পটে যাওয়ার জন্য ঘোড়ার কোন প্রয়োজন নেই। গল্ফ গ্রাউন্ডের দিকে তারের বেড়া দিয়ে রেখেছে যাতে গ্রাউন্ডে কেউ প্রবেশ করতে না পারে এবং থেকেই গল্ফ গ্রাউন্ড দেখবেন । ছাত্রাবস্থায় এখানে বহুবার এসেছি কিন্তু তখন কোন প্রবেশমূল্য ছিল না ও গল্ফ গ্রাউন্ডের দিকে তারের বেড়াও ছিল না এবং গ্রাউন্ডে অবাধে প্রবেশ করা যেত। বিকাল ৫টায় ফিরে চললাম সিমলা, গাড়ী থেকে লক্কড় বাজার কাছে নেমে হেঁটে লক্কড় বাজার ও রীজ হয়ে ফিরে এলাম কালীবাড়িতে।
পরের দিন ৭ তারিখে কিছু গরম কাপড় কেনাকাটা করব সাথে রীজ ও ম্যালকে মনের মত এনজয় করব বলে ঠিক করলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে কালীবাড়ির কেন্টিনে চা খেয়ে বেরিয়ে এলাম ম্যাল রোডের নীচে লোয়ার বাজারে। স্টুডেন্ট লাইফে বন্ধুদের নিয়ে এখানের একটি মিষ্টির দোকানে এসে প্রায়ই দুধ ও জিলিবী খেতাম এখন দেখলাম এই মিষ্টির দোকানটি আর নেই সেখানে একটি স্টেশনারী দোকান হয়েছে। কাছেই একটি মিষ্টির দোকানে দুধ, জিলিবী ও ক্ষীরের মিষ্টি খেলাম কিন্তু সেই আগের টেষ্ট পেলাম না, বয়সের সাথে সাথে আমার টেষ্টই হয়ত পাল্টে গেছে। এখান থেকে বেরিয়ে ম্যাল হয়ে এলাম রীজে, মেঘের সাথে সূর্যদেবের লোকচুরির মাঝে মেঘেররাজ্যে হারিয়ে যাওয়া বরফে ডাকা চূড়াগুলি মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছিল তা বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকর্তার আপন খেলা একটি বেঞ্চে বসে অনুভব করলাম অনেক্ষন। এরপর ম্যালে ঘোরাঘুরি করে সোয়েটার ও চাদর কিনে ফিরে এলাম কালীবাড়ীতে। লাঞ্চের পর রেষ্ট নিয়ে বিকালে আবার ম্যাল ও লোয়ার বাজারে গিয়ে কিছু কেনাকাটা করলাম। একটু বলে রাখি ম্যালের দোকানের তুলনায় লোয়ার বাজারের দোকানগুলিতে একটু সস্তায় কেনাকাটা করতে পরবেন । তবে উলের জিনিস সিমলায় কেনাকাটা না করে মানালীতে কেনাকাটা করুন অনেক সস্তায় পাবেন। আজ আর নয় আগামীকাল যাত্রা করব মানালীর উদ্দেশ্যে ।
৮তারিখ ভোরে খুম ভাঙ্গল, আজ চলে যাব মানালীতে। হিমাচল পরিবহন নিগমের সাইট থেকে অনলাইন সকাল ৯টা৩০মিনিটের এসি ভলভো বাসে মানালীর অগ্রিম টিকিট কেটে রেখেছিলাম একমাস আগে। বাস ছাড়বে সিমলা থেকে প্রায় ৮ কিমি দূরে টিটুকান্দি ISBT বাস স্টেন্ড থেকে। তাই সকাল ৮টায় তৈরী হয়ে কালীবাড়ি থেকে একজন কুলি নিয়ে কালীবাড়ির গেইটের বাম দিকে ১০০ মিটার ডাউন নেমে ডালঝিল হোটেলের নিকট কুলিকে ১০০টাকা দিয়ে বিদায় জানিয়ে এখান থেকে ৩০০টাকায় একটা অল্টো গাড়ী নিয়ে চলেএলাম ISBT স্ট্যান্ডে। গাড়ি ছাড়ল যথাসময়ে পাহাড়ি রাস্তা আর বিপদজনক সব বাঁক পেরিয়ে সুন্দরনগরের কাছে এক হোটেলের সামনে লাঞ্চের জন্য গাড়ি থামল। পথে অনেক আপেল ও বেদানার বাগান দেখতে দেখতে এবং নানা শহর পেরিয়ে কুলুতে পৌছলাম বিকাল ৫টায়। কুলু থেকে মানালী পর্যন্ত একদিকে খাঁড়া পাথুরে পাহাড় আরেকদিকে কলকল ধ্বনিতে পাথরের উপর লাফাতে লাফাতে আমাদের সাথে সঙ্গ নিল বিপাশা নদী। যখন মানালী বাসস্ট্যান্ডে আমাদের গাড়ি এসে পৌঁছল তখন পূর্ব আকাশে চাঁদমামা উঁকি দিয়ে আমাদের স্বাগত জানালেন।
মানালী:- বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি অটো নিয়ে এলাম প্রায় ১ কিমি দূরে ‘হোটেল ত্রিশূলে’ যা আগেই ‘মেক মাই ট্রিপ’থেকে বুক করে রেখেছিলাম । পরিষ্কার পরিছন্ন ওয়েল ডেকোরেইটেড বিশাল রুম, মনটা এমনেই খুসীতে ভরে গেল। সারাদিনের জার্নির দখল, গরম জলে স্নানে করে চা বিস্কুট খেয়ে একটু বিশ্রামের পর শরীরের ক্লান্তিভাব কাটল। রাত ১০টায় ডিনার সেরে চলে গেলাম ঘুমের রাজ্যে।
রোটাং পাস ও সোলাং ভ্যালি :- আজ ৯ তারিখ ভোরে রুম লাগোয়া বারান্দায় এসে দেখলাম সূর্যদেব তার সোনালী আভা মানালী পাহাড়ের এক অংশে ছড়িয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে পুরো পাহাড়কে সোনাঝরা আলোয় স্নান করালেন আর দূরে বরফে ঢাকা চূডাগুলি সাদা চিকচিক করছিল সে এক অপূর্ব দৃশ্য। মিতালী এই স্বর্গীয় দৃশ্য কিছু ক্যমেরাবন্দী করল। হোটেলের ট্রেভেল ডেক্স থেকে তিনদিন ট্যুরের জন্য গাড়ি বুক করেছিলাম গতকাল, আজ যাব রোটাং পাস, ফেরার পথে দেখব সোলাং ভ্যালি। হোটেলে প্রাতরাশ করার সময় দেখলাম ঠিক ডাইনিং হলের সাথে কয়েকটি গাছ ভর্তি পাকা আপেল । গাছের নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে অনেক আপেল। এরমধ্য ড্রাইভার রামপাল এসে দেখা করে গেছে। আমরা ও রেডি হয়ে সকাল ৮টায় বেরিয়ে পড়লাম রামপালের সাথে ৫১ কিমি দূরে রোটাং পাসের উদ্দেশ্যে। জুন-জুলাই থেকে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত গাড়ীতে যাওযায় রোটাং। বাকী সময় অগম্য থাকে তুষারাবৃত রোটাং। নেহরু কুণ্ড, কোটি, মারহি হয়ে টানা চড়াই রাস্তা ধরে পৌঁছে গেলাম রোটাং পাস। এই দুর্গম রোটাং পাসের একদিকে চলেগেছে স্পিতির রাস্তা আর অন্য দিকে আরেক রাস্তা গেছে লাহুল হয়ে লাদাখের দিকে। সেপ্টেম্বরে বরফশূন্য রোটাং পাসে বইতে থাকে ধূ ধূ ঠাণ্ডাবাতাস, তবে দূরের বরফাবৃত চূড়াগুলি আপনার মন ভরিয়ে দেবে আর ছবি তুলুন ইচ্ছামত। ফেরার পথে দেখলাম বিপাশার উৎপত্তিস্থল বিয়াসকুণ্ড, প্রাণভরে কুণ্ডের জল পান করে মিতালি বাড়ির জন্য নিল এক বোতল বিয়াসকুণ্ডের জল। এরপর এলাম দেবদারু শোভিত সবুজ উপত্যকা যা সোলাংভ্যালী নামে বিখ্যাত। অ্যাডভেঞ্চার প্রেমিদের জন্য এই ভ্যালীতে প্যারাগ্লাইডিং ও নানা অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের ব্যবস্থা আছে। ভ্যালীর রোপওয়েতে এলাম পাহাড়ের উপর এখানের চারিদিকের দৃশ্য অনবদ্য। সোলাংভ্যালী থেকে মানালীর পথে দেখে নিলাম নেহেরু কুন্ডু সাথেই রামসীতা ও শিবপার্বতী মন্দির আর পাশ দিয়ে বয়ে চলা খরস্রোতা বিপাসা নদী। বিকাল ৫টায় ফিরে এলাম হোটেলে। আজ আর নয় আগামীকাল বেরুব নূতন উদ্যমে।
লোকাল ট্যুর :- ১০ তারিখ সকালে একটু দেরীতে ঘুম থেকে উঠলাম। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে তাই লোকাল ট্যুর করব ঠিক করলাম। আজ আর বিশেষ তাড়া নেই তাই আস্তে আস্তে রেডি হয়ে হোটেলে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম রামপালের সাথে। প্রথমে এলাম বশিষ্ট মন্দিরে, সাথেই রয়েছে উষ্ণপ্রস্রবণ বশিষ্টকুণ্ড। নারী পুরুষের আলাদা স্নানের ব্যবস্থা আছে এখানে। কুণ্ডের গরম জলে আমরা ও স্নান করে শরীরকে সতেজ করে নিলাম। এরপর এলাম পাইন ও দেবদারু গাছে ঘেরা ছায়াসুনিবিড় এক অপূর্ব পরিবেশে বিখ্যাত হিড়িম্বা ও ঘটোৎকচ মন্দির চত্ত্বরে যা যেকোন পর্যটককেই মুগ্ধ করবে। এখান থেকে বেরিয়ে এলাম ক্লাব হাউস ,তার পাশেই পাইন বনের ভিতর দিয়ে পাথরের উপর লাফাতে লাফাতে বয়ে চলেছে মানালীর আরেকটি নদী মানালসু সে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। এরপর এলাম মানালী শহরে কাছেই খুবই সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে হিমালয়ান নাইঙ্গামাপা মঠের ভগবান বুদ্ধের মূর্তিটি যা সবারই ভালো লাগবে। মঠের চত্ত্বরে মেদিনীপুরের হরি দাসের বাঙ্গালী হোটেলে মাছ ভাত দিয়ে লাঞ্চ সেরে ড্রাইভার রামপালকে ছেড়ে দিয়ে চলে এলাম ম্যাল রোডে। এখানের কয়েকটি দোকান ঘুরে কিছু চাদর ও সোয়েটার কিনলাম । সিমলা থেকে অনেক সস্তায় উলেন গারমেন্টস্ পেয়ে যাবেন এখানে। ম্যালে ঘোরাঘুরী করে সময় কাটিয়ে সন্ধ্যা ৮টায় ফিরে এলাম হোটেলে। আজ এখানেই কলম রাখছি আগামীকাল ট্যুরে যাব মণিকরণ ও কুলু।
মণিকরণ ও কুলু :- ১১ তারিখ সকালে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম হিন্দু ও শিখদের পবিত্র তীর্থস্থান মণিকরণের উদ্দেশ্যে । রাস্তার দুপাশে গাছ ভর্তি লাল ও সবুজ আপেল বাগানের মধ্য দিয়ে ড্রাইভার রামপাল নিয়ে এল জগৎসুখ স্থানের গায়েত্রী মন্দিরে, এখানে দেবী ব্রহ্মরুপিনী,বিষ্ণুরুপিনী ও শিবরুপিনী ভাবে পূজিত হন। এখান থেকে এলাম ১৫০০ বছর আগে কুলুর রাজধানী নাগ্গর। ষোড়শ শতাব্দীর অপূর্ব কাঠের কারুকার্যমন্ডিত পাহাড়ের উপর নাগ্গর প্রাসাদ সবাইকে আকর্ষিত করে। এই প্রাসাদ থেকে নীচে নদী উপত্যকার দৃশ্য দেখে আপনি তারিফ না করে পারবেন না। এরপর উচ্ছল পূর্ণযৌবনা বিপাশার ধারা আর আপেল বাগানের নিবিড় সহচর্যে চললাম মনিকরণের পথে, একসময় মনিকরণ থেকে আসা পার্বতী নদী ও বিপাশার সংঙ্গম স্থলে রাস্তা আলাদা হয়ে পার্বতী নদীকে সঙ্গী করে এসে পৌঁছলাম মনিকরণ। হরপার্বতী মন্দির ও গুরুদ্বারের মধ্যে উষ্ণপ্রস্রবণ, ফুটন্ত জলের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি, এখান থেকে পাইপ দিয়ে গরমজল নিয়ে গুরুদ্বারে নারী পুরুষের জন্য আলাদা স্নানের ব্যবস্থা আছে। আমরা ও স্নান করেনিলাম ভাল করে। স্নান সেরে গুরুদ্বারের লঙ্গরখানায় পরমতৃপ্তিতে দুপুরের আহার করে লঙ্গরখানার উপরেরতলায় অপূর্ব কাঁচের তৈরী গুরুদ্বার দর্শন করলাম আমরা। এবার ফেরার পালা, মনিকরণকে বিদায় জানিয়ে বিকালে ফিরে এলাম স্রোতশ্বিনী বিপাশার তীরে কুলুর বৈষ্ণদেবী মন্দিরে। এখানে মহাকালী, মহালক্ষী, মহাসরস্বতী আর গুহার ভিতরে বৈষ্ণদেবী, হনুমানজী বিরাজমান । হামাগুড়ি দিয়ে গুহায় প্রবেশ করতে হয়। আরেকটি গুহায় আছেন ব্রহ্মা,বিষ্ণু,মহেশ্বর,শনি ও ভৈরব ঠাকুর। ইচ্ছে হলে এক বোতল সর্ষের তেল চড়াতে পারেন শনিঠাকুরকে। এই মন্দিরের অপূর্ব কাঠের কাজ যা আপনাকে মুগ্ধ করবে। মন্দির দর্শনের পর এলাম এক হ্যান্ডলুম ফ্যাক্টরি সহ সেলস্ কাউন্টারে। তাঁত মেশিনে সাহায্যে উলের চাদর, গারমেন্টস ও নানাবিধ হস্তশিল্পের জিনিস তৈরী হয় এখানে তবে সবকিছুর দাম বেশী লাগল। এখান থেকে বেরিয়ে ফিরে এলাম মানালীর হোটেলে তখন সন্ধ্যা আটটা। আজই মানালীতে আমাদের শেষ রাত, কাল চলে যাব বাসে চণ্ডিগড় হয়ে ট্রেনে দিল্লী।
আজ ১২ তারিখ ট্যুর প্রায় শেষ এখন বাড়ি ফেরার পালা। আন লাইনে সকাল ১০.৩০মিঃ এসি ভলভো বাসের চণ্ডিগড়ের টিকিট কেটে রেখেছিলাম আগেই তাই সময়মত তৈরী হয়ে হোটেলে প্রাতরাশ সেরে চলেএলাম রিসিপসন কাউণ্টারে। সকাল ১০টায় হোটেলপক্ষ তাদের গাড়িতে করে মানালী বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে দিল আমাদের। বাস ছাড়ল যথাসময়ে পাহাড়ী পথে চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ১১ ঘন্টায় এসে পৌঁছলাম চণ্ডিগড় তখন রাত প্রায় ৯টা৩০মিনিট। ISBT থেকে অটো নিয়ে এলাম চণ্ডিগড় রেল স্টেশনে। স্টেশনের কেন্টিনে ডিনার করে নিলাম । রাত ১টা৩০মিঃ নেতাজী এক্সপ্রেস আমাদের নিয়ে স্টেশন ছাড়ে সকাল ৬টায় পুরাতন দিল্লী স্টেশনে আমাদের ট্রেন এসে পৌঁছল। দিল্লীতে দুদিন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে দেখাসাক্ষাত করে ইন্ডিগো বিমানে আগরতলা হয়ে ফিরে এলাম কৈলাসহর বাড়িতে।
