আপনি জানেন কি প্রতি ১৪ দিনে পৃথিবী থেকে অন্তত একটি ভাষা হারিয়ে যায়?
সিলেটি হিসেবে জন্মলগ্ন থেকে আমরা মায়ের মুখে সিলেটি ভাষায় আদুরে কথা ও ডাক শুনেছি। এবং সিলেটি ভাষাতেই প্রথম কথা বলা শিখেছি আমরা।
‘সিলেটি’ একটি ভাষা হোক কিংবা উপভাষা, সিলেটি আমাদের মাতৃভাষা। সিলেটি ভাষাকে বাংলার উপভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও সিলেটি ভাষা একটি পরিপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা, এর পরিপূর্ণ বর্ণমালা ও সংস্কৃতি রয়েছে। আর প্রমিত ‘বাংলা’ হচ্ছে আমাদের প্রানের ভাষা,গানের ভাষা,মনের ভাষা,আমাদের আবেগ ও অনুভূতির ভাষা। জানলে অবাক হবেন যে ইউনেস্কোর তথ্যমতে আগামী কয়েক বছরে পৃথিবীর যে কয়েকটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া বা বিলুপ্ত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে তন্মধ্যে ‘সিলেটিও’ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যেকোনো ভাষাই মাতৃভাষা হতে পারে কিন্তু সকল ভাষা রাষ্ট্রভাষা হতে পারে না। প্রমিত বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা অপরদিকে সিলেটি,চাটগাঁইয়া বা নোয়াখাইল্যাও প্রত্যেকটিই একেকটি সতন্ত্র ভাষা এবং ভালোবাসার মাতৃভাষা। প্রমিত বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হয়ে চাটগাঁইয়া, সিলেটি কিংবা নোয়াখাইল্যাও হতে পারতো। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারনেই রাষ্ট্রভাষা নির্বাচিত হয়। ভাষা তার প্রয়োজনে সৃষ্টি হয়, অবহেলায় মরে যায়। ল্যাটিন ও সংস্কৃতির মতো সমৃদ্ধ ভাষাগুলোও তাই আজ বার্ধক্য পার করছে।

দু:খের বিষয় হচ্ছে, ‘সিলেটিকে’ অনাধুনিক ভাষা মনে করেন আমার মতো অনেক সিলেটিরা। তাই নিজেদের সন্তানদের প্রমিত ভাষা চর্চ্চায় জোর দেন প্রায় সবাই। প্রমিত ভাষা চর্চা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাই বলে কি মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে? এমনকি আমরা নিজেরাও সিলেটি ভাষায় কথা বলতে জড়তা বোধ করি এখন। ফলে ‘বিয়ান বেলা’ ‘মাদানে’ ইত্যাদির মতো কমন শব্দও আমরা ভূলতে বসেছি। ইউনেস্কোর একটি গবেষণায় দেখা গেছে গড়ে প্রতি ১৪ দিনে পৃথিবী থেকে একটি ভাষা হারিয়ে যায়। উপরের লাইনটি আবার পড়ুন- হ্যাঁ আপনি ঠিকই পড়েছেন, গড়ে প্রতি ১৪ দিনে পৃথিবী থেকে একটি পরিপূর্ণ ভাষাই হারিয়ে যায়। আমাদের মাতৃভাষাও (সিলেটি) হারিয়ে যাচ্ছে না তো? নিজের মাতৃভাষাকে বিলুপ্ত করার আত্মঘাতি পথে আমরা হাঁটছি না তো। এটা জেনে রাখা ভালো যে কথ্য বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে সবচেয়ে বড় অবদান রয়েছে সিলেটিদের এবং সিলেটি বাংলার। আপনি প্রতিবশী রাষ্ট্র ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়ে গেলে দেখবেন সেখানে হিন্দি বা স্থানীয় অন্যান্য ভাষার পাশাপাশি আরো একটি ভাষায় বড় একটি জনগোষ্ঠী কথা বলেন আর তা হলো সিলেটি। সিলেটি ভাষাকেই বাংলা ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয় সেখানে। লন্ডনে ভ্রমণ করতে গেলে আপনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হোন কিংবা রাস্ট্রপতি, সিলেটি সাতকরা দিয়ে রান্না করা তরকারি না খেয়ে বা সিলেটিদের আতিয়েথা গ্রহন না করে আপনার ফেরার সুযোগ ক্ষীণ।
সিলেটিরা অতিথি আপ্যায়ন করতে পছন্দ করে। সিলেটি ভাষাতে কথা না বলতে পারলেও সিলেটি ভাষা শোনা ও বুঝা আপনার জন্য অনেকটাই বাধ্যতামূলক। এছাড়াও কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য,অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স,ইতালি,পর্তুগালসহ ইউরোপ ও বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলা ও বাংলাদেশকে একচেটিয়া প্রতিনিধিত্ব করছেন সিলেটিরা। সিলেটিদের কারনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছে। যদিও আমাদের দেশের পঁচা রাজনীতি, রাষ্ট্রযন্ত্রের দেউলিয়াপনা,সন্ত্রাস,মৌলবাদ ও সহিংসতা অস্থিরতার কারনে সেই আগ্রহটা ‘আবেগে’ রুপান্তরিত হতে পারে নি। যাই হোক, আমরা সকল ভাষাকে সম্মান করবো এবং শিখবো এবং চর্চা করবো, কিন্তু সেটা নিজের ভাষাকে অপমান করে নয়, নিজের ভাষাকে বিলুপ্তের দিকে ঠেলে দিয়ে নয়। রাধারমণ, হাসন রাজা, দুরবিন শাহ কিন্তু বৃহত্তর কিন্তু সিলেটেরই সন্তান ছিলেন। তারা বাংলাকে বিশ্বের বুকে পরিচিত করেছেন।
সিলেটি ভাষার স্বতন্ত্র নাম ও বর্ণমালা আছে। আমাদের অবহেলার কারনে আমাদের বর্ণমালাকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। কথ্য ভাষা বা মুখের ভাষা ‘সিলেটিকে’ও আমার ‘মৃত্যু-ঝুঁকিতে’ ফেলে দিয়েছি। এরকম চলতে থাকলে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সিলেটি ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে। স্বাধীনতার পর আমাদের কোনো সরকারই আমাদের মাতৃভাষাকে মূল্যায়ন করেনি। আমাদের মাতৃভাষাকে সমৃদ্ধ করা তো দূরের কথা রক্ষা করতেও আসেনি। তাই আমাদের ভাষাকে রক্ষার দ্বায়িত্ব আমাদের নিজেদেরকেই নিতে হবে। মাতৃভাষাকে বাঁচাতে সকলের সম্মিলিত প্রয়াস ও চর্চা জরুরি এবং সকল ভাষাকে শ্রদ্ধা করা গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর সকল ভাষা সৈনিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
লেখক: আশীষ দে
(সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতি কর্মী)
মন্ট্রিয়াল, কানাডা

