তারিখটা ছিল জুলাইয়ের ১২, সালটা ১৯৭১। অন্যান্য দিনের মতোই পণ্ডিতবাড়ির উঠানে বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন প্রৌঢ় দুই ভাই। সহসাই গ্রামে হাজির হয় কয়েকজন পাকসেনা। সঙ্গে এদেশীয় কয়েকজন দালালও। পাকিস্তানি সেনাদের আসতে দেখে দিগি¦দিক ছুটে পালিয়েছিলেন গ্রামবাসী আর সঙ্গে পণ্ডিতবাড়ির সদস্যরাও। প্রৌঢ় সারদা পণ্ডিত এবং অন্নদা পণ্ডিত অবশ্য পালানোর তাগিদটুকু অনুভব করেননি। আট দশকেরও বেশি সময় নির্বিবাদে অতিক্রম করে জীবন সায়াহ্নে এসে এই দুই পণ্ডিতের স্বপ্নেও আসেনি যে, তারা পাকিস্তানি সেনাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন
ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার পরিচয় অল্প দিনের এবং অনেকটাই কাকতালীয়। তার শিকড়টা বৃহত্তর সিলেটে হলেও এখন তার পাসপোর্টের রং নীল। বৃহত্তর সিলেটের আরও অনেক বাসিন্দার মতো তিনিও থিতু হয়েছেন ব্রিটেনে। পেশায় ইনভেস্টমেন্ট কনসালটেন্ট। বড় বড় প্রজেক্টে ফাইন্যান্সিং অ্যাডভাইজ করেন। আমার মতো রোগীর পর রোগীর প্রেসক্রিপশন লিখে জীবিকা নির্বাহ করেন না। কাজেই আমার সঙ্গে তার পরিচিত হওয়ার অবকাশ প্রায় ছিল না বললেই চলে। তারপরও পরিচয়টা সহসাই এবং পরিচয়ের মাধ্যমটাও আরও বিচিত্র। আমাদের দুজনেরই বন্ধুস্থানীয় একজন কবির মাধ্যমে পরিচয় পর্বটার সূচনা। অতঃপর তার অনুরোধে এবং কবি বন্ধুর উৎসাহে ঢেঁকিটা গিলে আমার মৌলভীবাজারে হাজির হওয়া।
জানতাম, দুজন বিস্মৃতপ্রায় শহীদকে স্মরণ করতে জেলা শহরটিতে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে একজন আলোচক হিসেবে আমার উপস্থিতিটা প্রত্যাশিত। সঙ্গত কারণেই না-টা আর মন থেকে মুখে উঠে আসেনি। তবে ঢেঁকি গেলার অভিজ্ঞতা যে এতটাই অসাধারণ হতে পারে, তা এ যাত্রায় মৌলভীবাজার না গেলে অজানাই থেকে যেত।
গ্রামের নাম ঘড়ুয়া। ভৌগোলিকভাবে এর অবস্থান মৌলভীবাজার শহর থেকে অনতিদূরে। ঘড়ুয়া গ্রামে এখনো আছে পণ্ডিতবাড়ি। বাড়ির প্রয়াত দুই বাসিন্দা সারদা চরণ দাস আর অন্নদা চরণ দাস ছিলেন পেশায় শিক্ষক। এলাকায় একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে একদিন আলোও ছড়িয়েছিলেন এই দুই সহোদর পণ্ডিত ঘড়ুয়া গ্রামে আর আশপাশে। তারিখটা ছিল জুলাইয়ের ১২, সালটা ১৯৭১। অন্যান্য দিনের মতোই পণ্ডিতবাড়ির উঠানে বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন প্রৌঢ় দুই ভাই। সহসাই গ্রামে হাজির হয় কয়েকজন পাকসেনা। সঙ্গে এদেশীয় কয়েকজন দালালও। পাকিস্তানি সেনাদের আসতে দেখে দিগি¦দিক ছুটে পালিয়েছিলেন গ্রামবাসী আর সঙ্গে পণ্ডিতবাড়ির সদস্যরাও।
প্রৌঢ় সারদা পণ্ডিত এবং অন্নদা পণ্ডিত অবশ্য পালানোর তাগিদটুকু অনুভব করেননি। আট দশকেরও বেশি সময় নির্বিবাদে অতিক্রম করে জীবন সায়াহ্নে এসে এই দুই পণ্ডিতের স্বপ্নেও আসেনি যে, তারা পাকিস্তানি সেনাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন। মানুষকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করাটাও যে পাকিস্তানিদের চোখে অপরাধ, স্বাধীন পাকিস্তানে ২৪ বছর কাটিয়ে এই দুই পণ্ডিত ভ্রাতা সেটি ঠিকঠাকমতো বুঝে উঠতে পারেননি।
না, পাকিস্তানিরাও চিনত না সারদা কিংবা অন্নদা পণ্ডিতকে। সারদা প-িতেরই এক সাবেক ছাত্র ইঙ্গিতে তাকে চিনিয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তানিদের বুলেটে প্রথম লুটিয়ে পড়লেন সারদা প-িত। ভাইকে চোখের সামনে লুটিয়ে পড়তে দেখে অন্নদা প-িত আত্মরক্ষার্থে উঠে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। উরুতে প্রথম গুলিটি লাগায় লুটিয়ে পড়েন তিনিও। তারপর তাকেও বুলেটের আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে পাকসেনারা। পাকসেনারা চলে যাওয়ার পরও তাদের লাগিয়ে যাওয়া আগুনে রাত পর্যন্ত জ¦লেছিল পণ্ডিতবাড়ি।
পরদিন পণ্ডিতবাড়ির বেঁচে যাওয়া সদস্যরা ফিরে এসে দুই সহোদর পণ্ডিতের অর্ধদগ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার করেন। ধর্মীয় রীতিতে স্বাভাবিক সৎকারের সুযোগও জোটেনি দুই প-িতের কপালে পাকবাহিনীর স্থানীয় সহচর রাজাকারদের ভয়ে। প-িতদের প্রতিষ্ঠিত শ্মশানেও তাদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের সাহস পায়নি সেদিন গ্রামবাসী। গ্রামের হিন্দু-মুসলমান মিলে সারদা আর অন্নদা পণ্ডিতের মৃতদেহ চাটাইয়ে মুড়িয়ে ঘড়ুয়া গ্রামের পাশ দিয়ে বইয়ে যাওয়া মনু নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল এই প্রত্যাশায় যে, তারা যদি কোনোদিন পৌঁছাতে পারেন পবিত্র গঙ্গা অথবা যমুনায়।
এই দুই শহীদ পণ্ডিতের উত্তরসূরি আমার ফাইন্যান্সিয়াল ইনভেস্টার বন্ধু আর আমাদের দুজনের কবি বন্ধুর উদ্যোগে গত ২২ জুলাই এই দুই পণ্ডিতের স্মরণে মৌলভীবাজার শহরে একটি স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছিল আর সেই সুবাদেই আমার সর্বশেষ মৌলভীবাজার গমন। সেদিন দুই পণ্ডিতকে নিয়ে আলোচনা শুনতে বসে মনটা বিষাদে ছেয়ে আসছিল। এই পণ্ডিত ভ্রাতৃ যুগলের নাম শহীদদের তালিকায় অনুপস্থিত। তাদের জন্য একটি স্মারকস্তম্ভ বানাবার নাগরিক প্রত্যাশাও এখন পর্যন্ত উপেক্ষিতই রয়েছে। কাজেই মনটা বিষাদগ্রস্ত হওয়াটাই প্রত্যাশিত, উল্টোটা নয়। তবে এখন যখন দুই পণ্ডিতকে নিয়ে লিখছি তখন মনে হচ্ছে তারা বোধহয় সেদিন মরে গিয়েই বেঁচে গিয়েছিলেন। তাদের তো আর যাই হোক স্বাধীন দেশে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুতে একশ্রেণির শিক্ষিত বাঙালির মাতম আর ফেসবুকজুড়ে আজকের তরুণদের হাহাকার দেখে এই দুর্ভাগা দেশে বেঁচে থাকতে হয়নি!
লেখক : অধ্যাপক, ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
