নন্দদার মতো সহজ সরল, ন্যায়পরায়ণ লোকের অকালমৃত্যুকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। ধর্মবিশ্বাস আর পারলৌকিকতার বিশ্বাসে আমার ইচ্ছে জাগল যে নন্দদা মৃত্যুর পর স্বর্গলোকে কেমন আছেন তা জানতে। আর তাই আমরা চারজন বসে পড়লাম প্ল্যানচেটে নন্দদার আত্মাকে নিয়ে আসতে। সমস্ত উপকরণ তৈরী করে গভীর রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে একাগ্র চিত্তে ডাকতে লাগলাম উনাকে । চারদিক কাঁপিয়ে উনার আত্মা এসে হাজির। এসেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন –কেন ডাকছিস ? জানিসনে নরকের জেল থেকে পালিয়ে আসা কত কষ্টকর? আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম – সত্যি তুমি নরকে আছো? এমন ভালোমানুষকে ওখানেও নরকবাস করতে হয় ? নন্দদার অকপট উক্তি – সত্যি রে ভাই, যমের দিব্যি দিয়ে বলছি, নরকেই আছি। বিনামেঘে বজ্রপাতের মতোই ঠেকলো নন্দদার কথা । তাই বললাম, নন্দদা একটু বলে যাও না, কেন তোমার বিধি এমন বাম?
নন্দদা বলতে লাগলেন – ‘চিত্রগুপ্ত ফাইলপত্র নিয়ে দেবাদিদেব মহাদেবের শরণাপন্ন হয়ে বললেন – ‘প্রভু, নানা অপরাধে অপরাধীরা মর্ত্য থেকে এসেছে। অনেক নতুন বিষয় সম্পর্কে আমাদের স্বর্গ ও যমালয়ের পুস্তকে কিছু বলা হয়নি। এই অবস্থায় যমরাজও ভেবে পাচ্ছেন না কাকে কী শাস্তি দেবেন। তাই আপনার কাছে আমাকে পাঠিয়েছেন এর একটা বিহিত করতে। ‘
দেবাদিদেব বললেন – ‘তুমি এখন যাও । আমি তিনদিন পর যমালয় ও স্বর্গলোকের সব দেবতাদের নিয়ে একটা মহা বিচারসভা ডাকব। সেখানেই এসবের রায় ঘোষণা করব।‘
চিত্রগুপ্ত চলে এলেন। তিনদিন পর স্বর্গে বিচারসভা বসল। মহাদেব প্রধান বিচারকের আসনে বিরাজমান । নন্দী আর ভৃঙ্গী গাঁজার কল্কে সাজিয়ে প্রস্তুত। দেবতারা এক এক করে সবাই নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন। চিত্রগুপ্ত তার বিশাল খাতা নিয়ে মহাদেবের পাশেই বসলেন । মর্ত্য থেকে আগত আমরা সকলেই উপস্থিত।
দেবাদিদেব গাঁজার কল্কেতে সজোরে টান মেরে বললেন – চিত্রগুপ্ত খাতা খুলে বিচারসভা শুরু করো।
চিত্রগুপ্ত প্রথম ডাকলেন – ‘মহীপাল সান্ডা হাজির হও। ‘
কাঠগড়ায় ষণ্ডামার্কা দেহ নিয়ে সান্ডা উপস্থিত হল।
দেবী সরস্বতী শপথবাক্য পাঠ করালেন – ‘সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না। ‘
চিত্রগুপ্ত – ‘প্রভু, এই লোকটি মর্ত্য থেকে কাঠমাফিয়ার তকমা সেঁটে এসেছে। বড় বড় গাছ কেটে বাংলাদেশে পাচার করে অনেক বিত্তশালী হয়েছে এবং পরিবেশ দূষণও ঘটিয়েছে। ‘
মহাদেব বললেন – ‘কি হে বাপু, তুমি কাঠ মাফিয়া ? ছিঃ ছিঃ! এ তো গুরুতর অপরাধ !’
মহীপাল শিশুর মতো ভেউ ভেউ করে কেঁদে ঊঠে বলল –‘ধর্মাবতার, প্লিজ আমাকে কাঠমাফিয়া বলবেন না। বড় কষ্ট পাই । আমি একজন ছাপোষা শিক্ষক ছিলাম । প্রকৃতি আমাদের মা। তাই প্রকৃতিকে ভালোবেসে একদিন গভীর জঙ্গলে ঢুকি । ঢোকামাত্রই চারদিক থেকে ছোট ছোট গাছগুলি আর্তনাদ করতে লাগল – ‘স্যার, আমাদের বাঁচান । দেখুন আমাদের দেহের অবস্থা।‘ শুষ্ক,বিবর্ণ,অপুষ্টির শিকার গাছগুলিকে দেখে আমার কোমল হৃদয় ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল । আমি জিজ্ঞাসা করলাম – কারা তোমাদের এই অবস্থা করেছে ? ওরা কেঁদে কেঁদে বলল – ঐ যে বড় বড় ষাণ্ডামার্কা গাছগুলি । ওদের জন্যআমরা আলোবাতাস জল, প্রকৃতির দানের কোন কিছুই সঠিকভাবে পাচ্ছি না । মাঝপথে ওরা সব লুটেপুটে খাচ্ছে । এই গণতান্ত্রিক দেশে আমাদের কি বাঁচার অধিকার নেই? কেউ কি নেই আমাদের দেখার?
তাদের এই করুণ আর্তনাদ আমার হৃদয়কে ভেঙ্গে খানখান করে দিল । বনবিভাগের ছোট-বড় কর্তাদের এনে দেখালাম, এই ছোট ছোট গাছগুলোর করুণ অবস্থা । আমার থেকে ওরা যেন আরও বেশী ব্যথিত হলেন । আমি ভাবলাম, আমি যে সব কচিকাঁচাদের শিক্ষাদান করি তাদের ভবিষ্যৎ দেখার জন্য তো তাদের মা-বাবা, সরকার সবাই আছে । কিন্তু এই অসহায় যন্ত্রনাকাতর গাছগুলিকে কে দেখবে? তাই শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে দিয়ে ফরেষ্ট ডিপার্টমেন্টের লোক,সরকারী নেতা, বিরোধী দলনেতা সবাইকে নিয়ে এক পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে আমরা সবাই বড় বড় গাছ ছেদন আর ছোট ছোট গাছ বাঁচানোর কাজে লেগে পড়লাম । এখন আপনিই বলুন ধর্মাবতার, এটা কি কোন অনৈতিক বা অন্যায় কাজ করেছি?
মহাদেব নন্দীকে বললেন – ‘নন্দী, আমার কল্কেতে গাঁজার ভাগটা আর একটু বাড়িয়ে দে তো । ভীষণ সমস্যায় পড়েছি ।‘
এবার দেবাদিদেব কল্কেতে সজোরে টান মেরে বললেন – ‘না, তুমি তো কোনো ভুল করো নি । ন্যায়ের পক্ষেই কাজ করেছ ।‘
চিত্রগুপ্ত বললেন – ‘প্রভু ওর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে কাঠ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে ।‘
মহাদেব বলে উঠলেন –‘কি সাংঘাতিক! দেশের সম্পদ বিদেশে পাচারের অভিযোগ আছে? এ ত ভারী অন্যায়! সাণ্ডা, পাচারের জন্য তোমাকে শাস্তি পেতেই হবে। ‘
সাণ্ডা বিনয়ের সুরে বলল – ‘ ধর্মাবতারের রায়দানের আগে আমাকে এ ব্যাপারে একটু বলতে দিন । আমি মর্ত্যে এক সাম্যবাদী নেতা ছিলাম । সাম্য প্রতিষ্ঠাই আমার লক্ষ্য, পৃথিবীটা অসাম্যের যাঁতাকলে পড়ে ছটফট করছে । কোন দেশ অতি উন্নত, আবার অনেক দেশ অনুন্নত। এক দেশের মানুষ ভোগবিলাসে গা ভাসিয়ে দেবে, আর অন্য দেশের মানুষ অনুন্নতি আর ক্ষুধা নিয়ে বাঁচবে তা আমি মেনে নিতে পারিনি । আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশ আমাদের তুলনায় অনেক দুর্বল । তাই আমাদের জাতীয় সম্পদ ওদের দিয়ে পৃথিবীতে অসাম্য কমাতে চেয়েছি মাত্র । আর সেজন্যই লগগুলি আমেরিকায় বিক্রী করিনি । প্রভু, আমি কি ভুল করেছি ?’
মহাদেব বেশ কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে বললেন – ‘ না । তুমি তো সাম্যবাদের মহান আদর্শ রক্ষার কাজ করেছ মাত্র । এত উন্নত চিন্তাধারা দেখে আমি আবাক হচ্ছি। কে বলে তোমায় কাঠ –মাফিয়া ? কি রে ভৃঙ্গি, তুই কী বলিস?’
ভৃঙ্গী ঢুলুঢুলু চোখে বলল – ‘প্রভু, সত্যি আপনার সূক্ষ্মচিন্তার তারিফ না করে পারছি না । ‘
এবার দেবাদিদেব রায় দিতে গিয়ে বললেন –‘সবদিক বিচার বিশ্লেষণ করে আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে সাণ্ডা নির্দোষ । সে একজন সাম্যবাদী, প্রকৃতিপ্রেমীও সমাজসেবী । তাই তাকে সসম্মানে মুক্তি দেয়া হোক । সেইসাথে ইন্দ্রকে আদেশ দেওয়া হচ্ছে সাণ্ডার জন্য স্বর্গে সব সুবিধাযুক্ত টাইপ ফোর কোয়ার্টারের ব্যবস্থা করে দিতে ।‘
ইন্দ্র বললেন – ‘যথা আজ্ঞা প্রভু, তাই হবে।‘
দ্বিতীয় আসামী হাজির হল । চিত্রগুপ্ত বললেন – ‘প্রভু, এই আসামীর নাম শ্রীদাম । এরা মর্ত্যে ভূমি জরিপ বিভাগে কাজ করত । তারা অনেকে মিলে সরকারী জমি বেআইনী ভাবে অন্যের নামে জোত জমিতে পরিণত করে কয়েক শ কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছে ।‘
মহাদেব বললেন –‘এ তো মহাপাপ! তবুও আসামীকে বলতে দিতে হয়। শ্রীদাম, তোমার কি কিছু বলার আছে?’
শ্রীদাম অত্যন্ত কাতর সুরে বলতে লাগল –‘ধর্মাবতার, আমরা কোন অন্যায় করিনি। মর্ত্যবাসীর ভুল ধারনার শিকার আমরা । রামপ্রসাদ গেয়েছিলেন –‘কত মানবজমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা’ আমরা ভেবে দেখলাম রামপ্রসাদ তো ঠিকই বলেছেন । বছরের পর বছর সরকারের শত শত হেক্টর জমি পতিত পড়ে আছে, অথচ এইগুলিতে তো সোনা ফলানো যেত । তাই যারা খাস জমিতে সোনা ফলানোর অঙ্গীকার করলেন আমরা তাদের নামেই জমিগুলো লিখে দিলাম । আপনি বলুন ধর্মাবতার, পতিত জমিতে দেশের মঙ্গলের জন্য সোনা ফলানোর চেষ্টা করে কি ভুল করেছি ?’
মহাদেব বললেন –‘নন্দী, মাথাটা কেমন যেন গুল পাকিয়ে যাচ্ছে রে! তাড়াতাড়ি কল্কেটা দে তো । গাঁজায় দীর্ঘ টান দেওয়ার পর দেবাদিদেবের নার্ভাস সিস্টেম নর্মাল হল । ‘
তারপর বললেন –‘আমার চিন্তাধারায় তোমরা কেউ অন্যায় করোনি। যা করেছ দেশের মঙ্গলের জন্যেই । জমি পতিত রেখে বরং সরকার ভুল করেছে । সরকারী কর্মচারী হিসাবে সরকারী ভুল সংশোধন করা তোমাদের কর্তব্য । কেন যে মর্ত্যে তোমাদের নামে শাস্তির আদেশ হল তাই ভাবছি! তবে কি মর্ত্যের বিচারব্যবস্থায় কিছু গলদ আছে?’
এমন সময় চিত্রগুপ্ত বললেন – ‘প্রভু, এরা নাকি অবৈধ অর্থ দিয়ে বিশাল অট্টালিকা তৈরী করেছে । ‘
শ্রীদাম বলল –‘ধর্মাবতার, অট্টালিকা তৈরী করা কি পাপ? যত অট্টালিকা হবে মর্ত্যে, ততই দেশ উন্নত হবে । আমি তো মর্ত্যের উন্নয়ন যজ্ঞে কাজ করেছি মাত্র। তাছাড়া আমি যা তৈরী করেছিলাম সবই তো মর্ত্যেকে দিয়ে এসেছি । খালি হাতে গিয়েছিলাম, আবার খালি হাতেই ফিরলাম । বরং আগামীতে যাদের আপনারা সৃষ্টি করে মর্ত্যে পাঠাবেন তারা যাতে একটু ভালোভাবে বসবাস করতে পারে তার একটা ক্ষুদ্র ব্যবস্থা করে এসেছি। প্রত্যেকে আমরা পরের তরে – কবির এই আপ্তবাক্যের তো কোন অমর্যাদা করিনি । প্রভু, আপনিই বলুন আমার অন্যায় কোথায়?’
দেবাদিদেব এবার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন – ‘বৎস, তোমার উচ্চ চিন্তাধারা দেখে আমি অভিভূত । কে বলে জমি কেলেংকারী ? আসলে তো এটা জমির সদ্ব্যবহারের এক কার্যকরী প্রক্রিয়া । তোমাকে শাস্তি দেওয়া মানে ‘ন্যায়’ শব্দের অপমান করা । ইন্দ্র, তুমি কালই বিশ্বকর্মাকে দিয়ে শুধু শ্রীদাম নয়, মর্ত্য থেকে যারাই এই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে তাদের সবার জন্য সুদৃশ্য প্রাসাদের ব্যবস্থা করো । স্বর্গে এদের বড়ো প্রয়োজন। ‘
ইন্দ্র বললেন – ‘যথা আজ্ঞা প্রভু । ‘
দেবাদিদেব ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন । এক ঘন্টার জন্য বিচারসভা মুলতুবি রেখে নিজ কক্ষে বিশ্রামের জন্য গেলেন । নন্দী আর ভৃঙ্গী উনার সেবায় এগিয়ে গেল । দেবাদিদেব জিজ্ঞাসা করলেন – ‘কি রে নন্দী ভৃঙ্গী,আমার রায় দান তোদের কেমন লাগছে ?’ দু’জনেই সমস্বরে বলল – ‘প্রভু, একসেলেন্ট ! মর্ত্যে একটি কথা প্রচলিত আছে,’কিং ক্যান ডু নো রং’ – ঠিক তেমনি আপনি ভুল করতে পারেন না । ‘
মহাদেব তাদের কথা শেষ হতেই কেমন যেন অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন । নন্দী-ভৃঙ্গী ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল – ‘প্রভু, ইজ দেয়ার এনিথিং রং?’
দেবাদিদেব জিজ্ঞেস করলেন – ‘আচ্ছা,সত্যি করে বল তো এমন রিং রিং করা ভাষা তোরা কবে কোথা থেকে শিখলি, আমি নিজেই বলতে পারি না !’
ভৃঙ্গী বলল – ‘প্রভু, স্বর্গে গাঁজার ভাণ্ডারে শর্ট পড়ায় আমি ক’দিন আগে মর্ত্যে গাঁজা আনতে চলে যাই । ওখানে এসবের ভালো চাষাবাদ হয় । সেখানে গিয়ে এক শ্মশানঘাটে গিয়ে দেখি, মৃতের অনেক বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়েরা শোক ভোলার জন্য বোতল থেকে ওদের ভাষায় ইংলিশ মাল খাচ্ছে । আমি কয়েকটি বোতল চুরি করে নিয়ে আসি । আমি আর নন্দী একটু আগে দু পেগ মেরে দিয়েছি । এখন প্রভু ইংরেজি ছাড়া কথা বলতে ইচ্ছে করছে না । শুধু ইয়েস নট এসব বলতে ইচ্ছে করছে ।‘
মহাদেব গম্ভীর কন্ঠে বললেন – ‘আমার কথা তোদের একবারও মনে পড়ল না ?’
-পড়েছে প্রভু, তাই তো একটা স্যাম্পল আপনার জন্য রেখেছি। দেবো ?
মহাদেব –‘নিশ্চই দিবি । নতুবা সবাই কি বলবে – যে, দেখ চেলারা ইংরেজি বলতে পারে আর প্রভু পারে না । এ হয় না । আগামী রায়গুলি আমি ইংরেজিতে দেবো। ‘
এইবার দেবাদিদেব জলের সাহায্য না নিয়েই ইংরেজির পুরো পাত্র গলাধঃকরণ করে বললেন – ‘সত্যি রে, মাঝে মাঝে অবাক হই যখন দেখি সৃষ্টি স্রষ্টা থেকে বড় হয়ে যাচ্ছে ! মাইরি যা বানিয়েছে! তোর মা এখানে থাকলে আমি বিচারসভা ছেড়ে হানিমুনে যেতাম । ‘
নন্দী জিজ্ঞেস করল – প্রভু, হানিমুন কি ?’
দেবাদিদেব বললেন – ‘আর কি,কোথাও বসে মুনের দিকে তাকিয়ে দু’জনে মিলে ফোঁটা ফোঁটা করে হানি খাওয়া । ‘
এরই মধ্যে ভৃঙ্গী বলল-‘প্রভু,এক ঘন্টা হয়ে গেছে । চলুন, বিচারসভা শুরু করুন । আপনি ভয় পাবেন না, আমি আর নন্দী আপনাকে এজলাসে বসিয়ে দিয়ে আসছি । ধরাধরি করে এজলাসে বসিয়ে দিল ।
দেবাদিদেব বললেন – ‘হিডেন পিকচার, স্টার্ট দ্য প্রসিকিউশন । ‘
সভা একেবারে চুপ। কেউ কিছু বলছে না। এবার মহাদেব একটু বিরক্তি সুরে বললেন –‘কি হে চিত্রগুপ্ত ,তোমার কানে কি কিচ্ছু যাচ্ছে না ?’
চিত্রগুপ্ত বললেন – প্রভু, আপনর কথার কোনো অর্থ বুঝতে পারিনি । আপনি কি ভাষায় কথা বলছেন ?’
নন্দী বলল-‘চিত্রগুপ্তজী, ডোন্ট ওয়রি।‘
চিত্রগুপ্ত অবাক হয়ে বললেন –‘নন্দী, তুমিও প্রভুর ভাষায় কথা বলছ ? এ ভাষা তো স্বর্গে কখনও কাউকে বলতে শুনিনি !’
নন্দী বলল-‘এত উতলা হবেন না। আমি সব খুলে বলছি । এসব ইংরেজী ভাষা ।
চিত্রগুপ্ত অতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বললেন –‘দেবরাজ ইন্দ্র, এখানেও কি ইংরেজরা এসে গেল? শুনেছি ভারতবর্ষে নাকি ওরা দু’শো বছর রাজত্ব করেছে। আমরাও কি তাহলে ঐ দাসত্বের অধীনে থাকব?’
ইন্দ্র কম্পিত হয়ে সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তৎক্ষণাৎ নন্দী বলল-‘উঠবেন না দেবরাজ ইন্দ্র, ভয়ের কোনো কারণ নেই। স্বর্গে শুবু আমাদের কারণে ওদের ভাষাটা এসেছে মাত্র। ওরা আসে নি। তাছাড়া ওদের তৈরী একটা অমৃত সুধা খাওয়ার ফলে আমাদের মুখ থেকে ওদের ভাষা বেরুচ্ছে। আসলে এখন আর ওরা ততোটা সাম্রাজ্যবাদী নয়। একটু পরেই ওদের বস্তুর প্রভাব আমাদের উপর থেকে চলে যাবে তখন দেবাদিদেবও আপনাদের পরিচিত ভাষায় ফিরে আসবেন। ‘
ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতারা আশ্বস্ত হলেন। ইন্দ্র নিজ আসনে উপবিষ্ট হলেন।
নন্দী চিত্রগুপ্তকে বলল- ‘ইংরেজীতে আপনার নাম হিডেন পিকচার। অর্থাৎ হিডেন মানে গুপ্ত,আর পিকচার মানে চিত্র। তাই আপনার নাম হিডেন পিকচার। ‘
চিত্রগুপ্ত বললেন –‘সত্যিই কি সুন্দর ভাষা! দেবরাজ ইন্দ্র, আমি প্রার্থনা করছি আমাকে আপনারা সবাই হিডেন পিকচার বলে ডাকবেন। ইশ্ ! সারা শরীর রিং রিং করছে !‘
ততক্ষনে ইংরেজির প্রভাব দেবাদিদেবের ওপর থেকে কমে গেছে। তিনি বললেন –‘চিত্রগুপ্ত, পরবর্তী আসামী হাজির করো।‘ পরবর্তী আসামী রুপচাঁদ লালা উপস্থিত হল।
চিত্রগুপ্ত ফাইল ঘেঁটে বললেন-‘প্রভু,এই লোকটা দেশের টাকা লুট করে সুইস ব্যাঙ্কে কালো টাকা হিসাবে জমা রেখেছে। ‘
দেবাদিদেব জিজ্ঞেস করলেন –‘ভৃঙ্গী, টাকা কী রে? ‘
ভৃঙ্গী বলল-‘প্রভু, ওটা মর্ত্যের জাদুকাঠি। ‘
মহাদেব- ‘তার মানে ?’
ভৃঙ্গী-‘ মানে হল এটা দিয়ে আপনি জাদুকাঠির মতো সবকিছু করতে পারেন। এখানে যেমন ইন্দ্রের আদেশে মেনকা বা ঊর্বশীরা সবার সামনে নৃত্য করে। কিন্তু মর্ত্যে টাকা ছাড়া নর্তকীরা এক পা-ও নড়বে না। ভোগ-বিলাস-উন্নয়ন সবই এটা দিয়ে হয়।
দেবাদিদেব – ‘কি বলিস ভৃঙ্গী ? এ তো আমার গাঁজার মতো মূল্যবান বস্তু। ‘
ভৃঙ্গী বলল-‘প্রভু, আপনার গাঁজাও এটা দিয়ে পাওয়া যায়, আবার গাঁজা দিয়েও টাকা পাওয়া যায়। ‘
দেবাদিদেব–‘তাহলে রূপচাঁদ দেশের অমূল্য সম্পদ পাচার করে গুরুতর অন্যায় করেছে। রূপচাঁদ, তোমায় তো শাস্তি পেতেই হবে। ‘
রূপচাঁদ কেঁদে বলব-‘ ধর্মাবতার, আমায় একটু বলতে দিন। ‘
দেবাদিদেব–‘ বলো তাহলে এটাই লাস্ট চান্স। ‘
নন্দী কানে-কানে ভৃঙ্গীকে বলল-‘ দেখেছিস এখনও প্রভুর উপর থেকে ইংরেজি মালের প্রভাব যায়নি। বোতলগুলি লুকিয়ে রেখেছিস তো? প্রভুকে কিন্তু আর এক ফোঁটাও নয়। না হলে মা দুর্গা কিন্তু আমাদের গর্দান দেবেন।
ভৃঙ্গী- তুই এসব ভাবিস নে। সব ব্যবস্থা আমি করে এসেছি। তুই কি আমাকে ইন্টেলেকচুয়েল ভাবিস না?
নন্দী- এত রাগ করিস কেন ? এবার রূপচাঁদের কথা শুনতে দে।
রূপচাঁদ – প্রভু,মর্ত্যের অর্থনৈতিক দেহে টাকাটা আমাদের দেহের রক্তের মতো। দেহে রক্ত বেশী হলে যেমন হাই ব্লাডপ্রেসার হয়, তেমনি কম হলে দেহ রক্তাল্পতায় ভোগে। ঠিক তেমনি দেশে টাকা কম থাকা যেমন খারাপ আবার বেশী থাকাও খারাপ। আমাদের দেশে টাকা বেশী হওয়ায় জিনিসের দাম দিন-দিন বাড়ছে। গরীব মানুষের কষ্ট হচ্ছে। তাই আমরা কিছু ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ দেশের মঙ্গলের জন্য কিছু টাকা গোপনে দেশ থেকে সরিয়ে নিয়ে বিদেশের ব্যাঙ্কে রেখেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল দেশে আবার টাকা কমে গেলে ঐগুলি এনে দরিদ্রদের সেবায় লাগাব।
দেবাদিদেব জিজ্ঞেস করলেন – ‘গোপনে কেন টাকা রাখতে গেলে? ‘
রূপচাঁদ বলব-‘ধর্মাবতার, আমাদের দেশের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ লোক নিরক্ষর। তাই তারা বুঝতে পারবে না যে তাদের মঙ্গলের জন্যই আমরা টাকা সরিয়ে নিচ্ছি। এজন্য গোপনে রেখেছি। ধর্মাবতার যদি দ্রব্যমূল্য কমিয়ে গরীবদের বাঁচাতে গিয়ে কোন অপরাধ করে থাকি তাহলে আপনি যে শাস্তি দেবেন আমি মাথা পেতে নেবো। ‘
দেবাদিদেব বললেন – ‘কি রে ভৃঙ্গী, একথা কি টাকার ক্ষেত্রে খাটে?‘
ভৃঙ্গী বলল- হ্যাঁ প্রভু, একশ ভাগ সত্যি। ‘
দেবাদিদেব– ‘আমিও ভাবছি, যে লোক কপালে পবিত্র চন্দনের ফোঁটা দেয়,সাদা ধুতি-পাঞ্জাবী রে থাকে সে তো কোনো অন্যায় করতে পারে না। সত্যি ভৃঙ্গী, তুই আমাকে একটা অন্যায় কাজ করার হাত থেকে বাঁচালি। ‘
তারপর দেবাদিদেব রায় দিলেন– যাও রূপচাঁদ, তুমি নির্দোষ। স্বর্গে অবস্থান করো। আগামীতে স্বর্গের ক্ষতিকারক অতিরিক্ত বস্তু তুমি মর্ত্যে পাচার করে স্বর্গকে রক্ষা করো। ‘
রূপচাঁদ বলব-‘ধর্মাবতার, আপনার ন্যায়বিচার দেখে ভবিষ্যতে আমার পাচার করার উৎসাহ বাড়বে। আর মর্ত্যবাসী আমার বন্ধুরাও এই কাজে উৎসাহিত হবে। জয় দেবাদিদেবের জয়।‘
নন্দদা বললেন- ‘রূপচাঁদের পর এল আমার পালা। ‘
দেবাদিদেব চিত্রগুপ্তকে বললেন – ‘ভালো করে দেখো তো মর্ত্যে সে কোন সামাজিক ভালো কাজ করেছে কি না?‘
চিত্রগুপ্ত বললেন –‘প্রভু, ওর রেকর্ড বলছে যে লোকটা অত্যন্ত সংসারী ছিল। যা কাজ করেছে স্ত্রী-পুত্রের স্বার্থে। তবে সাহিত্য নিয়ে ব্যস্ত থাকত। তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু পাচ্ছি না। ‘
দেবাদিদেব জিজ্ঞাসা করলেন -‘এই নন্দী, তুই গাঁজাটাজা আনতে মর্ত্যে যাস। সাহিত্য মানে কি বল্ তো?’
নন্দী অনেক্ষণ চিন্তা করে বলল-‘প্রভু,স্ব-হিতের জন্য মানে শুধু নিজের মঙ্গলের জন্য যা করা হয় তাই হল সাহিত্য। ‘
দেবাদিদেব বললেন –‘এ তো সংঘাতিক আপরাধ। মানবসমাজে বসবাস করে শুধু নিজেকে নিয়েই ভাবা। সমাজের জন্য কোন কিছু না করা। নিজের পরিবার, নিজের স্বার্থরক্ষার কাজ করা গুরুতর আপরাধ। ‘
আমি বলতে গিয়েছিলাম-‘প্রভু, সাহিত্য মানে –‘। এতটুকু বলার পরই দেবাদিদেব বললেন –‘আর বলতে হবে না। সাহিত্যের অর্থ আমার জানা হয়ে গেছে। আমি রায় দিচ্ছি ওকে যেন অনির্দিষ্ট কালের জন্য কারাগারে বন্দী করা হয়। ‘
এ কথা বলে নন্দদা বললেন –‘বুঝতেই পারছিস, মর্তে ভ্রষ্টাচারীরা যেমন সুখে আছে ওখানে গিয়েও ওরা স্বর্গসুখে আছে। আর আমার মতো ছাপোষা সাধারণ মানুষদের যন্ত্রণা স্বর্গ-মর্ত্য সব জায়গায়ই তাড়া করে বেড়ায়। আমি আর দাঁড়াতে পারছি না। কোন প্রহরী আমাকে যমালয়ের সেলে না দেখতে পেলে আরও কঠোর শাস্তি পেতে হবে। ‘
একথা বলতে বলতেই নন্দদা হাওয়ায় মিশে গেলেন। আর আমরা চারজন বসে বসে ভাবতে লাগলাম আমরাও কি স্বর্গবাসী হওয়ার বন্দোবস্ত করব?
